অপ্রেম পত্র (প্রথম অংশ)

বাবুয়া, আজ বহু বহু দিন পর আবার তোমায় চিঠি লিখছি ।মাঝে মাঝে যে চিঠি লিখতে ইচ্ছে হয় নি, এ কথা বলা মিথ্যা বলা হবে ।ইচ্ছে করে, ভীষণই ইচ্ছে করে – কিন্তু কিছু আর গুছিয়ে উঠতে পারি না ।কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছি ।যত্নে গাঁথা মালা ছিঁড়ে মোতিগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে ।কি জানি, কেন মাঝে মাঝে ছিঁড়ে যায় আমার গাঁথা মালা ।আর ছেঁড়েই যদি, আমি কেন সেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া মোতিগুলো কুড়িয়ে আবারও মালা গাঁথি ?! নিজেকে চেনাও বুঝি বা সম্পূর্ণ হল না আজও আমার । তুমি বারবার বলো, আমি তোমায় ভুল বুঝি ।আগে খুব অভিমান হত এমন শুনে ।হাজারো অভিযোগ, না পাওয়া আমার মনের দরজায় কড়া নেড়ে নেড়ে ডাকতো আমায় ।আমি দু’হাত দিয়ে কান চাপা দিয়েও স্থির থাকতে পারতাম না ।এক সময় ঠিক দরজা খুলে দিতাম ।আর সেই কষ্টগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ত আমার ওপর ।আমি ক্ষত বিক্ষত হয়ে যেতাম তাদের আক্রমণে ।যন্ত্রণাদগ্ধ রক্তাক্ত প্রায় অবসন্ন মন নিয়ে সেই তোমার কাছেই যেতাম, আবারও চাইতে ।তুমি আশ্বাস দিতে, আমি অপেক্ষা করতাম ।অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্য্যহারা হয়ে অভিমানে নিজেকে পোড়াতাম ।আর তুমি?! সেই পোড়া গন্ধে বিরক্ত হতে ।কিন্তু কখনো পোড়া গন্ধের উৎসের খোঁজ করো নি । এখন আর আগের মত কষ্ট হয় না জানো ।এখন আমি একটু একটু করে চুপ থাকতে শিখে যাচ্ছি ।সত্যি সত্যি, আমিই নিশ্চয় ভুল বুঝি তোমায় ।ভালোবাসা মানেই তো কাছের মানুষটিকে যে কোন মূল্যে ভালো রাখা ।তবে নিশ্চয় আমিই ভুল বুঝি তোমায় ।তোমার ভালোবাসা পেয়েছি বলেই তো সমস্ত ন্যায় অন্যায় বোধ বিসর্জন দিয়ে দিকশূণ্য হয়ে তোমার দিকে ধাবিত হয়েছি।তবু কেন এই শূন্যতা, কিসের এই না পাওয়া বোধের অসহায় অসহনীয় যন্ত্রণা?! আমারই বোধহয় ভালোবাসার খিদে বেশি, তাই কিছুতেই মন ভরে না ।নয়তো আমার ভালোবাসাতেই বুঝি বা সেই জোর নেই ।আমি তোমার পিছুটান, কিন্তু তুমি যে আমার গন্তব্য।পিছুটান আর গন্তব্য-একটা সরল পথের দুই প্রান্ত।তাই কী এত দূরত্ব?? কী জানি!! কেন জানি না, আজকাল বড্ড একা লাগে, অসহায় লাগে ।ক্লান্তি আমার সমস্ত সত্ত্বাকে গ্রাস করে নিয়েছে ।চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে, তবু ঘুম আমায় স্পর্শ করে না ।আমি কী তবে নিজের সাথে লড়াই করতে করতে একেবারে ফুরিয়ে যাচ্ছি?! চারিদিক কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে ।দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে – “এই বরফপাত, এই কঠিন রাত /তোমার পুরোনো অজুহাত /এই আলোর নীচে কাঁপতে থাকা /ছায়ায় শিকড় ছিঁড়তে চাই /এই উল্কাপাত, এই বিশ্রী রাত /আচমকা এই গোপন আঁতাত /সব ধ্বংস হওয়ার আগেই আমি /তোমার চোখে ভিজতে চাই /আর কেউ তোমার ভাষাতে/সমুদ্রের ভালোবাসাতে /ফিরিয়ে নিয়ে গেল তোমায়/আহত ঝিনুক সৈকতে /আর চিরাচরিত জীর্ণতায় /আমার প্রেমের দিগ্নতায় /সব রেকর্ড করা থাকবে /তোমার অন্তবর্তী শূন্যতায় /যদি এক মুহূর্তের জন্যও আমায় চাও /সেটাই সত্যি!! ” ………. সেটাই সত্যি!!!!!

জীবনের মরুভূমিতে অনেকটা পথ দিকভ্রান্ত তৃষ্ণার্ত পথিকের মত ঘুরে হঠাৎ জলের সন্ধান পেয়েছিলাম যেদিন সেদিন ঠিক ভুল বিচার না করেই আঁজলা ভরে আকণ্ঠ জল পান করেছিলাম পিপাসা মেটাতে ।আজ ভেবে পাই না,মৃত্যুমুখী তৃষ্ণা নিবারক সেই জলেই বিষ ছিল,নাকি সেই অমৃত ধারা আমার বিষাক্ত সংস্পর্শে এসে তীব্র বিষে পরিণত হয়েছে । একবার ভালোবাসার সাথে দিন যাপনের অভ্যাস হয়ে গেলে সেই ভালোবাসাকে ভুলে থাকা বোধহয় অসম্ভব ।তাই বারবার, বরাবর আগলে রাখতেই চেয়েছি ।চাওয়া পাওয়া, অভিমান, অভিযোগ, দাবি, খারাপ লাগা – সমস্ত বোধকে মহীরুহ অস্তিত্ব থেকে ছাঁটাই করে বনসাই – এর আকার দিয়েছি—-শুধু সম্পর্কটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য ।কিন্তু আর কত………… আজ ৩০শে অক্টোবর ।আজ অবধি কোনো কনফার্মেশন যখন পাই নি, তখন কাল যে দেখা হচ্ছে না সেটা কনফার্ম।আমি যদিও অবাক হয় নি, কারণ এটাই এক্সপেক্টেড ছিল তোমার থেকে ।অ্যাজ ইউজুয়াল……. জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর….. হা হা হা…!!! ভুল যা কিছু তা আমারই।বহমানতার উল্টো স্রোতে মাথা তুলে এক মুঠো জ্যোৎস্না ধরার জন্য সাধের জীবনটাকেই দাও লাগিয়ে দিয়েছিলাম ।দশ মাস সযতনে সেই জ্যোৎস্নাকে মুঠো করে গর্ভধারণ করেছি, বহমানতার বিপরীতে নিজস্ব এক স্রোতের জন্ম দেব আশায় ।আজ বেশ ক’দিনের দীর্ঘ প্রসব বেদনা সহ্য করে আমি জন্ম দিয়েছি মৃত প্রেম, যা বহমান ধারা আমার বুকের থেকে কেড়ে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ।অমাবস্যার জ্যোৎস্না বিহীন অন্ধকার রাতে আজ আমি সম্পূর্ণ একা। আমি জানি, আমি আজও তোমার দরজায় গিয়ে দাঁড়ালে এই নিঃস্ব অসহায় মেয়েটাকে তুমি ফেলে দেবে না ।চারিদিক দেখে নিয়ে সন্তর্পণে মনের খিড়কি দরজা খুলে দেবে যাতে যাতে চুপি চুপি সবার অজ্ঞাতসারে আমার অনুপ্রবেশ সম্ভব হয়।তাই আমিই ফিরতে পারছি না ।যেখানে সদর দরজা খুলে কেউ আমাকে স্বাগত জানাই না, যে আশ্রয় পেতে মাথা উঁচু করে নিজের দাবিতে ঢোকার বদলে চোরের মত খিড়কি দরজা দিয়ে পা টিপে টিপে ভয়ে ভয়ে যেতে হয় সে আশ্রয় আমার চাই না ।তার চেয়ে নিরাপত্তাবিহীন আগল ছাড়া আমার একলা বসত ঢের ভালো ।কী হবে, খুব বেশি চুরি যাবে, কিছু ধূসর রঙের স্মৃতি, কিছু রক্তাক্ত শুচিতা, কিছু ভাঙা ভাঙা স্বপ্ন । আবারও বলবে, আমি তোমায় ভুল বুঝলাম ।কিন্তু এটা তোমার মস্ত ভুল ।অতীতের বোঝা যেমন বর্তমানে মূল্যহীন, তেমনই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত ভালোবাসায় বর্তমানের শীতলতা ঘোচে না ।বর্তমানকে গলা টিপে হত্যা করে ভবিষ্যতের জন্য বাঁচা যায় না ।তোমার ভালো হোক ।তোমার স্ত্রী, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পরিচিত, গুণমুগ্ধ মানুষদের সান্নিধ্যে কর্তব্য পালনকেই উচিত বলে জেনেছো, তার মধ্যেই থাকো নিশ্চিন্তে, প্রশ্বাস নাও এবং নিঃশ্বাস ফেলো ।দৃশ্যমান পার্থিব মুহূর্ত বন্দী করাতেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছো, তাকেই শিল্প বলে জেনেছো – তাই করো ।যা অপার্থিব, যাকে বন্দী করা সম্ভব নয়, সেই এত দামী, এত চোখের জলের, এত বদনামের, এত গভীর যন্ত্রণার প্রেমের প্রাপ্তির মূল্য দিয়েছো চূড়ান্ত অবহেলায় । আমি জানি, আমি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকবো না ।কিন্তু চালাকির পরকীয়া আমার জন্য নয় ।তার চেয়ে না হয় জানবো বেলাশেষের অন্ধকারে প্রেমের ঘর গড়েছিলাম, তাই সূর্যোদয়ের আগেই আমার সে সাধের ঘর চোরাবালি গ্রাস করছে….. ……………..
শ্রী(সোনাই)
 
Sankhasathi Pal

Sankhasathi Pal

মফস্বল শহরের মেয়ে।পড়াশোনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে ।বর্তমানে মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষাদান জন্য প্রশিক্ষণরত।ভালো লাগে গান, সাহিত্য চর্চা এবং ফটোগ্রাফি ।

More Posts

Related posts

Leave a Comment