আত্মা এবং অহং

আমাদের মধ্যে বিরাজ করেন আত্মা এবং অহংবোধ। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে এই দুটি বস্তু সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী।এই দুই বিপরীতধর্মী বস্তুর সহাবস্থান আছে আমাদের অন্তরে। আলো -অন্ধকার ,দিন -রাত্রির মতোই  এরা যুগপৎ অবস্থান করে আছে।আমাদের কথায়  মূলতঃ প্রাধান্য পায় এই অহং। আমার ছেলে ,আমার স্বামী ,আমার বাড়ী ,আমার টাকা -আরও কত কী। কিন্তু এই ‘আমি ‘বা ‘আমার ‘উৎপত্তিস্থল কোথায় ? উপনিষদে ‘অহম ক:’?-এই প্রশ্ন আছে। আমি কে ?কোথা থেকে এলাম ?মৃত্যর পরে আমি কোথায় যাব ?এরই নাম আত্মজিজ্ঞাসা। আত্মজিজ্ঞাসা মানে আত্মাকে জানার ইচ্ছা। বেদান্তের মূল তত্ত্বই হচ্ছে আত্মজিজ্ঞাসা বা ব্রহ্মজিজ্ঞাসা। এই আত্মাকে জানতে পারলেই আমাদের সামনের সব পর্দ্দা সরে যাবে ,আমাদের জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটবে , আমাদের অবিদ্যা এবং মোহ  নাশ হবে। যতক্ষণ না এই মোহনাশ হচ্ছে ,আমরা নিজেকে জানতে পারব না। মোহনাশের শেষে ,অন্ধকার সরে গেলে আমরা বুঝতে পারব অহং বলে কিছুই নেই। এবং তখনই আমাদের চৈতন্য হবে।

আমরা যতক্ষণ অজ্ঞান বা জ্ঞানান্ধ থাকি ,ততক্ষণই ‘আমার -আমার ‘করি এবং ক্রমশঃ বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু যখন আমরা অনুধাবন করি ,আমার বলে কিছুই নেই -আত্মা হচ্ছে পরমাত্মার একটি অংশ মাত্র  ,সবই পরমাত্মার সৃষ্টি এবং লীলা -তখনই আমরা পরম শান্তি এবং মোক্ষ বা নির্বাণ লাভ করি।  আমাদের অন্তর থেকে সব দীনতা ,মলিনতা মুছে যায়। আমরা প্রশান্তি লাভ করি।

কিন্তু এই পথটি অত সহজ নয়। অজ্ঞতা খুব শক্তিশালী। সে সব সময় আমাদের মোহপাশে জড়িয়ে রাখতে চায়। কেননা ,অজ্ঞতার মধ্যে আছে আপাতঃ সুখ। অজ্ঞতা নামক মোটা ,পুরু পর্দ্দা আমাদের ,আত্মার থেকে দূরে রেখে দেয়। এই অজ্ঞতাই হচ্ছে অহংবোধ বা পরিভাষায় যাকে বলি ego .’আমি করেছি ‘-হচ্ছে অহংবোধ। ‘তোমার কর্ম তুমি কর মা ,লোকে বলে করি আমি ‘-হচ্ছে জ্ঞান। অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আমরা স্বার্থপর হয়ে যাই -শুধু নিজেরটুকু গোছানোর ধান্দায় থাকি সর্বক্ষন।

কিন্তু এই অহংবোধকে আমাদের পরাস্ত করতেই হবে। আমরা তীর্থক্ষেত্রে যাই ,মন্দিরে যাই -কিন্তু এতে কাজের কাজ কিছু হয় না। বরং কবিগুরুর ভাষায় বলতে গেলে ‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে ,অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে। ‘ধর্মই আমাদের সামনে মোহরূপে এসে ধরা দেয়।

বরং যারা এই তথাকথিত ধর্মের প্রথা অগ্রাহ্য করে চলেন ,তাদের আমরা নিন্দা করে বলি নাস্তিক। ‘নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর /,ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর। ‘হয়তো এই তথাকথিত নাস্তিকরাই  সঠিক পথ অবলম্বন করেছেন -হয়তো তারাই ‘অহম ক :’-এই গূঢ় প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু আমরা নিজেদের অজ্ঞতার জন্য এদের চিনতে পারি না।

ধর্ম মানে পরমাত্মাকে জানা। নিজের মধ্যে ,পৃথিবীর প্রতিটি অণু ,পরমাণুতে পরমাত্মার উপলব্ধি অনুভব করাই হল ধর্ম। এই আত্মজিজ্ঞাসা বা ব্রহ্মজিজ্ঞাসাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। স্বামী বিবেকানন্দ তাই বলেছেন –

‘ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু সর্বভূতে সেই প্রেমময়

মন প্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে ,এ সবার পায়। ‘

ধর্ম মানে উপলব্ধি বা বোধ। পার্থিব বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে ,আমাদের অন্তঃস্থ ,সুপ্ত আত্মাকে জাগ্রত করাই হোক আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য। স্বামীজী বলেছেন -‘Awakening of the spirit within us ‘.

এই মোক্ষ লাভের উপায় হিসাবে বেদান্তে তিনটি যোগের কথা বলা হয়েছে -জ্ঞানযোগ ,কর্মযোগ এবং ভক্তিযোগ। বেদান্ত দর্শনে আরও একটি যোগের উল্লেখ আছে -সেটি হল রাজযোগ। নির্বাণ বা মুক্তি লাভ করতে গেলে যে কোনও একটি যোগ বা কয়েকটি যোগ মিশ্রণ করে অনুসরণ করলেই হবে। এটিই হল ধর্মের প্রাথমিক কথা। তীর্থযাত্রা ,প্রতিমা দর্শন ,মন্দিরে যাওয়া হল লোক দেখানো ধর্ম। যতক্ষণ অজ্ঞানতা আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে আমরা আসল ধর্মপালনে বিরত থেকে এই লোক দেখানো ধর্ম পালনেই আমাদের সময় অযথা ব্যয় করি।

প্রকৃত ধর্ম পালন করতে হলে অহংবোধকে আমাদের থেকে চিরতরে ছিন্ন করতে হবে। আত্মা ছাড়া সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। সময়ের প্রবাহে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে -জীব মাত্রেরই মৃত্যু আছে। কিন্তু আত্মা চিরন্তন -তার কোনও লয় ,ক্ষয় নেই -সে স্থান পরিবর্তন করে মাত্র। ‘অহং’মাত্রেই জন্ম ,মৃত্যু ,ব্যাধির চক্রে আবর্তিত হবে। কিন্তু আত্মা নিত্য ,মুক্ত ও শুদ্ধ। সুতরাং অহং কখনও স্থায়ী শান্তি দিতে পারে না।

উপরে উল্লিখিত প্রতিটি যোগ ই বলছে অহংকে ভুলে আত্মাতে মনোনিবেশ কর। জ্ঞানযোগ আমাদের শেখায় -শরীর ,মন ,অহং -কোনওটা  নয় -আত্মাতে একাগ্রচিত্ত হও। কর্মযোগ মানে পরার্থে ,পরের জন্য কর্ম করে যাওয়া। কর্মযোগ মেনে কর্ম করতে হলে অহংকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে হবেই। কিন্তু বাস্তবে আমরা যা করি তা হল সম্পূর্ণ উল্টো। অপরকে ভুলে নিজেকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা কাজ করি। এটি অবশ্য পরিত্যাজ্য।কাজ করার সময় অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতে হবে। তাহলেই তো আমরা সমগ্র বিশ্বের সাথে নিজেকে জুড়তে পারব ,বিশ্বের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারব। এই ভাবে নিষ্কাম কর্ম করলেই আমরা পরমাত্মার সাথে যুক্ত হতে পারব।নিজের ঘরে স্বার্থান্ধ হয়ে কূপমণ্ডূক  হয়ে আটকে না থেকে ,বিশ্বঘরে নিজেকে ঠাঁই করে দিতে পারলেই তো আমাদের মুক্তি।

ভক্তিযোগ  হচ্ছে নিজেকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে পরমাত্মার চরণে আত্মনিবেদন। আমি যা করব  সবই পরমাত্মার জন্য করব। এই ভাবেই আমাদের অন্তঃস্থ ‘অহং ‘-এর মৃত্যু হয়ে আত্মার বিকাশ ঘটবে এবং পরমাত্মার সঙ্গে তার মিলন ঘটবে।

রাজযোগ ও একই পথের নিশানা দেয়। যখন আমাদের মন পরমাত্মায় নিয়োজিত হবে ,তখন পার্থিব মোহবন্ধন আমাদের আর নাড়া দিতে পারবে না। আমাদের চিন্তা ,অনুধ্যান পরমাত্মাময় হয়ে উঠবে। কোনও বায়ুশূন্য স্থানে যদি কোনও মোমবাতি জ্বলে -তবে তার শিখা কাঁপে না ,স্থির থাকে। সেইরকম আমাদের মন পরমাত্মাময় হয়ে গেলে বাইরের কোনও আলোড়ন আমাদের বিচলিত করতে পারবে না।

তখন আমরা নিজেরাই আমাদের অন্তরে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করতে পারব।আমাদের মনে তখন শুধুই ঈস্বরচিন্তা -আর কিছু থাকবে না। তখনই আমরা ক্ষুদ্র অহংকে পুরোপুরি ভুলে গিয়ে শুধু পরমাত্মাকে স্মরণ করব।

উপরে উল্লিখিত সব কটি যোগের মধ্যে ভক্তিযোগ মেনে চলা খুব সোজা। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন -‘ভক্তিপথ সহজ পথ। ভক্তিপথ তোমাদের পথ। ‘ভক্তিযোগে  কিন্তু অহংবোধ আছে। কিন্তু এ আমি শ্রীকৃষ্ণের ভাষায় ‘পাকা ‘আমি -যে আমি বলে তুমি যন্ত্রী আমি যন্ত্র। তুমি চালাও আমি চলি। ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা ,আমি যে পথ চিনি না। ‘শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে মা কালী যেমন।

ভক্তিপথের যাত্রা শুরু হয় ভিন্নবোধ থেকে -আমি আর তুমি। কিন্তু শেষে এই আমি মিশে যায় তুমিতে। ‘সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে। ‘কিন্তু এই মিশে যাবার পথটি খুব সহজ নয়। এর জন্য চাই জপ ,উপাসনা। জপ করতে করতেই মন উপাসনার জন্য প্রস্তুত হয়। উপাসনার উপর জোর দিতে হবে। মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় হল উপাসনা। মন্দিরে গিয়ে প্রতিমার গায়ে জল ঢেলে ,দুধ ঢেলে,ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো করে সময় নষ্ট না করে উপাসনায় মন দেওয়া উচিৎ। উপাসনা করলে চঞ্চল মন স্থির হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন -‘মন যোগীর বশ ,যোগী মনের বশ নয়। ‘দীর্ঘসময় ,দীর্ঘকাল ধরে উপাসনা করা উচিৎ।

জপ এবং উপাসনা করলে মনকে বাইরের চঞ্চল জগৎ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়। তবেই মন পরমাত্মার পায়ে নিবদ্ধ হয়। এইভাবেই আমাদের অন্তরে অবস্থিত আত্মার প্রকাশ ঘটে। আত্মার জাগরণ হলেই তা আস্তে আস্তে পরমাত্মায় মিশে যায়। বারে বারে জপ এবং উপাসনা করলেই এটি সম্ভব হবে। ১০৮ বারের বেশী বার দিনে জপ করতে হবে। যতবার সম্ভব করতে হবে। শ্রী শ্রী সারদা মা বলেছেন ১০ থেকে ১৫ হাজার বার দিনে জপ করতে।

যারা সব সময় কাজের কাজের মধ্যে থাকেন তাদের জন্য গীতার  ১৮ নম্বর অধ্যায়ের ৬৬ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন -‘মামেকং শরনং ব্রজ ,অহম ত্বাম সর্বপাপেভ্যঃ মোক্ষয়িষ্যমি ‘-সব সময় আমাকে স্মরণ কর। আমিই তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন সমস্ত কাজের মধ্যেও তাঁকে স্মরণ করে কাজ করতে।

আর একটি কথা ,শুধু জপ বা উপাসনা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে করে বাকি সময় পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের পিছনে ধাওয়া করলে কিন্তু হবে না। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মতে একটি নৌকোকে পাড়ের গাছের সাথে বেঁধে রেখে যতই দাঁড় টান ,নৌকো নড়বে না। যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে। অনুরূপভাবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পার্থিব বন্ধন থেকে নিজেকে বিরত করতে এবং রাখতে হবে। কেননা এই পার্থিব বিষয় আশয় সবই ক্ষনিকের এবং ক্ষণিক সুখ দেয় মাত্র। পাশাপাশি সচ্চিদানন্দের   সাথে মিলনই  হচ্ছে চিরস্থায়ী। একবার এই মিলন হলে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না। তখন আর কর্মও করতে হবে না। কর্ম ত্যাগ করলেও চলবে। আমরাই তখন স্থিতপ্রজ্ঞ হয়ে উঠব -সুখ , শান্তি ,দুঃখ ,মৃত্যু আর আমাদের বিচলন ঘটাতে পারবে না।

পরমাত্মাকে পাবার জন্য ,তাঁর সাথে মিলিত হবার জন্য ,রোখ চাই। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন -খুব রোখ না হলে চাষার যেমন মাঠে জল আসে না ,সেই রকম মানুষেরও ঈশ্বর লাভ হয় না।

আমরা আমাদের সুস্থ মনের থেকে সুস্থ শরীরের দিকে বেশী নজর দিই। আমাদের শরীর অসুস্থ হলে আমরা ডাক্তারের কাছে গিয়ে তাঁর পরামর্শমত ওষুধ কিনে খাই ,শরীরের যত্ন নিই  ,ডাক্তারের অনুশাসন মানি। কিন্ত মনের উন্নতির জন্য আমরা কোন যত্ন নিই না। কেননা ,আমরা ভাবি ,মনের দিক দিয়ে আমরা সুস্থ। এই ধারণা একেবারেই ভুল। আমাদের মনের মত  সব কিছু না ঘটলে আমরা দুঃখিত হই। কেউ আমাদের খারাপ কথা বললে আমরা মুষড়ে পড়ি। সারাদিন আমাদের মন খারাপ থাকে। কোনও খারাপ ,অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটলে  আমরা মনমরা হয়ে পড়ি। কিন্ত মনকে আমাদের বশে রাখতেই হবে। আমরা মনকে বশে না রেখে শরীরকে বশে রাখার চেষ্টা করি প্রতিনিয়ত।

এই অবস্থায় আমাদের আত্মা যখন এক জন্ম থেকে আরেক জন্মে যায় ,তখন সেই নতুন জন্ম একটি তাজা শরীর আর এমনি একটি অসুস্থ মন নিয়ে জীবন শুরু করে। সুতরাং ক্রমাগত আমাদের মনের অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হবে। এ কাজটি করতে হবে আমাদেরই। তা না হলে ,বহু জন্ম লেগে যাবে আমাদের পরমাত্মার সাথে মিলিত হতে।

Urmila Sen

Urmila Sen

ঊর্মিলা সেন সুরেন্দ্রনাথ সান্ধ্য কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপিকা। অধ্যাপনার পাশাপাশি উনি বাচিক শিল্পের সাথেও যুক্ত আছেন। অধ্যাত্ম বিষয়ে উনি নিয়মিত বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন। এছাড়া , বিধাননগর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ কেন্দ্রে উনি একই বিষয়ে পাঠও করেন। নিউ টাউন বই মেলা সমিতির সাথেও উনি প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত আছেন।

More Posts

Related posts

Leave a Comment