ইণ্টারভিউ

একটা স্কুল গেট। মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। দুই পাশে মাঠ। রাস্তার শেষে তিনতলা বিল্ডিং। রবিবারের সকাল স্কুলটা দেখে পছন্দ হয়ছিল রাহুলের। তাই অনিচ্ছা স্বত্তেও রাহুল তার স্ত্রী রাণুকে নিয়ে হাজির হয়েছিল ইন্টারভিউ দিতে। মেয়ে তিন্নিকে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করানোর জন্য।

স্কুল গেটের দিকে এগোতেই সিকিউরিটির দিকে চোখ গেল। চোখ যেতেই নিজের মনে ফিক্‌ করে হেসে নিল রাহুল। এরা যে কি জিনিস যারা সামনা না করেছে তারা ছাড়া কেউ বোঝে না। এমনকি এক বড় কোম্পানির ম্যানেজার রাহুলকেও ঘোল খাইয়ে দিয়েছিল। ক্লাস সিক্সের মেয়েকে নতুন করে সি বি এস ই স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে প্রথম দিকে তার একটা দুটো স্কুলে গিয়ে সিকিউরিটির প্রশ্নের জবাবে বেশ বিব্রত হয়ে পড়ত-

-কোথায় যাবেন?

-এই ভর্তির খবর নিতে।

-এখন হবে না, কোন্‌ ক্লাস? সিক্স? অসম্ভব!

পত্রপাঠ বিদায় করে দিত রাহুলকে। এরকম দুই একটা অভিজ্ঞতার সামাল দিয়ে রাহুল শিখল সহজ কথা যায় না বলা সহজে। তাই যখন পরের দিকে সিকিউরিটি প্রশ্ন করত

-কোথায় যাবেন?

-এই প্রিন্সিপালের কাছে। উনি ডেকেছেন।

এই সহজ উত্তরের মাধম্যে চিচিং ফাঁকের মত স্কুলের দরজা উন্মুক্ত হত তার সামনে। তারপর ভেতরে ঢুকে আরেক গোবেচারা কাউকে ডেকে তার সহায়তায় প্রিন্সির ঘরে প্রবেশের সুবিধা। কিন্ত ওই পর্যন্তই। তারপর প্রিন্সি যখন মুখ আর নাক বিকট করে জানিয়ে দিত ঠাঁই নাই, তখন মুখ চুন করে ভগ্ন হৃদয়ে তাকে ফিরে আসতে হত। শিক্ষা মানুষের জন্মগত অধিকার। আর অর্থবল থাকা স্বত্তেও স্কুলে ভর্তি নিয়ে হয়রানি তাকে আক্ষরিক অর্থে বিব্রত ও বিরক্ত করে তুলেছিল।এটা সত্যি স্কুলের হাতের বাইরে নাকি স্কুলের প্রচার, তা বোধগম্য হত না। কিন্ত সে হাল ছাড়ল না।

অবশেষে সুযোগ মিলল। দুটো স্কুল থেকে আহ্বান এল অ্যাডমিশন টেস্ট দেওয়ার জন্য। দুটো স্কুলের মধ্যে থেকে একটা স্কুলে মেয়ে চান্স পেয়েও গেল।এটা সেই স্কুল। আজ ইণ্টারভিউ। তবে মেয়ের নয়- মেয়ের বাবা মায়ের। স্কুলের ভেতরে ঢোকে রাহুল।

স্কুলের একটা কনফারেন্স রুম। রুমের বাইরে কতক চেয়ার পাতা। আরো দুই এক শিক্ষার্থীর বাবা মা এসেছেন। কিছু জনের সাথে আলাপ হল। একে একে ডাক পড়তে লাগল ভেতরে। রাহুলদেরও ডাক পড়ল। তারা ভেতরে গেল।

রুমের মধ্যে একটা লম্বা টেবিল। টেবিলের একদিকে চার পাঁচজন শিক্ষক, মধ্যমণি প্রিন্সিপাল মিসেস ডি’সুজা। টেবিলের আরেক প্রান্তে রাহুলদের বসার আসন।মেয়ের কাগজ পত্র, আগের স্কুলের কাগজ পত্র পরীক্ষা করে প্রিন্সি রাহুলের মুখের দিকে তাকালেন-

-Yes Mr. Das, Please tell me after spending so many years outside why have you come to Kolkata?

প্রিন্সির এই গুগলির জন্য একেবারেই সে প্রস্তুত ছিল না। এত একেবারে ব্যক্তিগত স্তরে হানা দেওয়ার প্রচেষ্টা। রাহুল বেশ হতচকিত হয়ে গেল। বেশ মনে পড়ে গেল সে দিনের কথা। ব্যাঙ্গালোরের এক নামী বিদেশি কোম্পানীতে কাজে ব্যস্ত ছিল সেদিন। হঠাত ফোন বেজে উঠল।সে অন্যমনস্ক হয়ে ধরল ফোনটা; বাবার গলা।

-হ্যাঁ, বল বাবা।

-কেমন আছ তুমি? বৌমা কেমন আছে? আর আমার নাতনীর খবর কী?

-সবাই ভাল আছে। তোমাদের খবর কি? মায়ের শরীর কেমন?

– ভাল নয়। সে জন্যই তোমায় ফোন করা। দেখ বাবা, আমাদের বয়স হয়েছে, তোমার মায়ের শরীর নিয়ে আমি ভয়ানক চিন্তিত। এই বয়সে একা হাতে সব সামলানো সম্ভব নয়। তাই তুমি এসে যদি হাল ধর, তাহলে বুড়ো বয়সে দিনগুলো একটু শান্তিতে কাটে আর না হলে আমাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়।

মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে রাহুলের। গভীর চিন্তায় তার মুখ বেঁকে যায়। আত্মরক্ষার তাগিদে সে বলে,- তোমাদের কোলকাতায় থাকতে কে বলছে? ওখানকার সম্পত্তি সব বেচে দিয়ে এখানে চলে আসলেই তো সব সমস্যা মিটে যায়।

-সেটা সম্ভব নয় বাবা। তুমি তো জানই কি ভাবে সংসারের থেকে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে আমাদের এই বাড়ি বানিয়েছি। বেশি তো নয়, এক তলা মাত্র। এই বাড়ির টান কিছুতেই ত্যাগ করা সম্ভব নয়। আমি মরে গেলে তুমি কি করবে সেটা তোমার ব্যাপার , কিন্ত আমি এ কাজ পারব না।

বাবা একজন নীতি পরায়ণ, নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। বহু কষ্ট করে, লোন করে তাকে মানুষ করে তুলেছেন।কিন্ত মুখ ফুটে কোনদিনও নিজের কষ্টের কথা ছেলের সামনে প্রকাশ করেন নি। স্বল্প বাক্‌, আত্মসম্মানী, অভিমানী এক ব্যক্তি। বাবা ও মায়ের জন্য চিন্তা ও উদ্বেগ বেড়ে গেল রাহুলের। বাড়ির এক ছেলে হয়ে সে তার বাবা মা’র প্রতি দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। আবেগ ও কর্তব্যবোধের তাড়নায় তড়িঘড়ি ব্যাঙ্গালোর থেকে পাততাড়ি গোটায়। অর্ধেক এর কম মাইনের চাকরী হাতে নিয়ে রাহুল ফিরে আসে কোলকাতা।

কিন্ত তার এই ব্যক্তিগত ব্যাপার কোন মতেই বাইরের দশজনের কাছে চর্চার বিষয়বস্ত করে উঠতে রাজি নয়। তার মনের ব্যাথা রাগে পরিণত হয়ে উঠল;

-That is none of your business. Being An Indian I can move wherever I want. However it is your duty to provide education at your school if she qualifies.

রাহুলের এই তীব্র জবাবে বিরক্ত হয়ে রাণু তাকে পা দিয়ে সটান একটা গুঁতো মারল। গুঁতোর রাহুলের সব রাগ উবে গেল। আর ওপ্রান্তে বসা শিক্ষক শিক্ষিকারা একসাথে দাঁড়িয়ে উঠে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে শুরু করল ;

-This is not the way of talking. You should have to appologise.

-What should I do if she ask like this?

নিজের অসহায়তা ব্যক্ত করল রাহুল। এবার প্রিন্সি সবাইকে শান্ত করলেন। শান্ত কণ্ঠে রাহুলকে বললেন,

-You may go now.

বেরিয়ে এল বটে কিন্ত মনে মনে প্রস্তুত হতে লাগল অজানা ঝড়ের সামনা করতে। শুধু বাড়ি নয়, এমনকি শ্বশুর, শাশুড়ি সবাই নানা প্রশ্নবাণে তাকে বিদ্ধ করল। এভাবে মাথা গরম করে মেয়ের ভবিষ্যত নষ্ট করার অর্থ কি?

রেগে গিয়ে রাহুল প্রতি আক্রমণের পথ ধরল। বিকল্প শিক্ষা নিয়ে মুম্বাই, ব্যঙ্গালোর, পুণে তে যে কাজ চলছে তা তার মাথায় ছিল। সে রাগত স্বরে জানাল,

-মেয়ের লেখাপড়ার দরকার নেই। বাড়িতে বসে সেতার শিখুক।

এর উত্তরে কারো কিছু বলার ছিল না। শুধু দীর্ঘস্বাস পড়ছিল সবার মুখ থেকে।

এর কিছুদিন পরের ঘটনা। লেটার বক্স খুলে রাহুল দেখল সেই স্কুল থেকেই একটা চিঠি। মেয়ে সিলেক্টেড হয়েছে সেটা জানিয়ে আমন্ত্রণ চিঠি।

Rajkumar Raychaydhuri

Rajkumar Raychaydhuri

ছন্দে বাঁধা জীবনে না হেঁটে ভিন্ন পথে চলতে ভালবাসা এক পথিক। ভাল লাগে লিখতে, নেশা আছে ঘুরতে। কারিগরী বিদ্যায় হাত পাকানো। বিকল্প শক্তি নিয়ে কাজকর্মে জড়িত।

More Posts

Related posts

Leave a Comment