কাঁটাতার

২৩ শে মার্চ, ১৯৪০ মুসলিম লীগের সংখ্যা গরিষ্ঠতা অঞ্চল নিয়ে মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে এ কে ফজিলুল হক প্রস্তাব করেন লাহোর প্রস্তাব। দ্বিজাতী তত্ত্বই জন্ম দিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের। সময় এগিয়ে গেছে, গড়িয়ে গেছে দেশ ভাগ নিয়ে অনেক জল। ধর্ম-জাত-পাত সব কিছুর জন্য দেশ যখন ছাইয়ে পরিণত হচ্ছে তখনই সদ্য গজিয়ে ওঠা ভ্রুন হয়ে জেগে উঠেছিল একটি সম্পর্ক। নীরা আর অভি আবদ্ধ হয়েছিল প্রেমের বন্ধনে।করিমগঞ্জ এর প্রখ্যাত সান্যাল বাড়ীর আদুরে কন্যা নীরা ছোটো থেকেই বাবার আদর মাখা স্নেহে বড়ো হয়ে উঠেছে। ছোটো বেলাতেই মা কে হারিয়েছে নীরা।নীরার বাবা অচীন বাবু হিন্দু হলেও সমস্ত ধর্মের মানুষকে ভালোবাসতেন। এই জন্য অবশ্য তাঁকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ছোটো থেকেই নীরা মানুষ হয়েছে ঝুমুর পিসির কাছে। অচীন বাবুর বন্ধু হাফেজ মিঞার স্ত্রী ঝুমুর ছোটো থেকেই তার ছেলে সায়েদ আর নীরার মধ্যে পার্থক্য দেখেন নি। নীরা অবশ্য সায়েদের থেকে ছোটো।নীরাই সায়েদ কে অভি নামে ডাকত।তখন সে বুঝতো না ধর্ম কি জিনিস। কোন ধর্মে কি নাম হয়। তবে অভি নামটা সায়েদের খুবই পছন্দ হয়েছিল। গ্রামের পাঠশালা, দালানকোঠা, বারান্দা, চিলেকোঠা আরা মেঘনা নদী ছিল তাদের বড়ো হয়ে ওঠার সাক্ষী।দেশ তখন স্বাধীনতার জ্বরে আক্রান্ত। নেহেরু-গান্ধী-জিন্নাহ-নেতাজী তে তোলপাড় সমগ্র দেশ। জাতীয় কংগ্রেসের বড়ো বড়ো নেতাদের ওঠা বোসা ছিল নীরাদের বাড়িতেই। সভা সম্মেলন এসব তো লেগেই থাকত। নীরার বাড়িতে আসা উচ্চবর্গীয় নেতারা কখনই সায়েদদের পচ্ছন্দ করত না, কারন তারা মুসলমান।সান্যাল বাবুর কাছে অনেকেই নালিশ করেছেন এ বিষয়ে।ওপর থেকে চাপও এসেছে অনেক।কিন্তু সান্যাল বাবু তার ছোটো বেলার বন্ধুকে সামান্য ধর্মের জন্য কখনই ভুলে যেতে পারবেন না তা স্পষ্ট করে দেন বাববার। মা মরা মেয়ে টা কে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে ঝুপুর। মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা দিয়েছে। স্নেহের কোনো ধর্ম হয়না। সামনে যাওয়া বারণ তাই আড়ালে থেকেই অভি শুনতো সভা-সমতির সব স্বদেশ বক্তিতা। দেশের প্রতি প্রেমটা বেড়েছে দিনে দিনে কিন্তু সুযোগ হয়নি দেশপ্রেমটা কে প্রমাণ করার। সে অপেক্ষা করত সেই দিনটার যে দিন সে সত্যিই দেশপ্রেমিক হয়ে উঠবে, ধর্মের বিচারে নয় প্রেমের বিচারে স্বাধীন করবে তার দেশ মাতা কে।মেঘনা নদীর জল গড়িয়েছে অনেক, আর সময়টা কেটেছে অনেক গুলো বছর। নীরা অভি এখন অনেকটাই পরিনত।ছোটো বেলা থেকে একই বৃন্তে বেড়ে ওঠা দুটি কুসুম নীরা-অভি গ্রামের মাঠ ঘাট আর সবুজ ক্ষেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছে। বর্ষায় যখন মেঘনা নদী জলে ভরে উঠত ঢোঙা নিয়ে জয় করে নিত নদীর ওপার। কাশ বন, সবুজ ক্ষেত আর রবীন্দ্ররচনা সমগ্রী ছিল নাম না জানা দেশে তাদের হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গী। অভি ঘাস ফুল দিয়ে নূপুর তৈরি করে পরিয়ে দিত নীরার পায়ে, কতই যে খুশি হত তা সে নিজেও বলে বোঝাতে পারত না। নীরা খুব ছোটো ছোটো বিষয়েই আনন্দ পেত আর বলত অভি দা তোকে আমি কোনো দিনই ছেড়ে থাকতে পারবো না। শৈশবের বেড়ে ওঠা ভালোলাগা গুলো পরিনত কৈশরের ভালোবাসায় পরিনত হয়ে যায় তাদের অজান্তেই। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে প্রেম। পরিনত বয়ষে তারা বুঝতে শিখেছিল ধর্মের রঙ টা, তাও বয়ে যাওয়া সময় গুলো আলাদা করতে পারেনি তাদের।

সান্যাল বাবুর কাছে মেয়েকে নিয়ে এসেছে অনেক অভিযোগ। মেয়ে বড়ো হয়েছে তাও একটা মুসলমান ছেলের সাথে সারাদিন ঘুরে বেড়ানো মেনে নিতে পারচ্ছিলনা সমাজ, অন্যদিকে মা মরা মেয়ে আর বাল্যকালের বন্ধুর জন্য ভালোবাসা টা কখনই কমাতে পারেননি সান্যাল বাবু। চাপ অবশ্য হাফেজ মিঞার উপরও এসেছে অনেক। এই নিয়ে এক প্রকার সমস্যার সম্মুখিন যখন তারা, সেই সময় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আলপনা আর প্রদীপে সেজে উঠেছে করিমগঞ্জ এর সমস্ত হিন্দু বাড়ি। বাড়িতে বাড়িতে চলছে লক্ষী দেবীর আরাধনার প্রস্তুতি। নতুন শাড়ী,গা ভর্তি গয়না,রক্ত রঙা আলতা পায়ে আর কপালে লাল টিপে সেজে উঠেছে বাড়ির মেয়ে বউরা। পায়ে নপূর, হাত ভরা চুড়ি, কালো কাজল চোখে, লাল পাড় শাড়ী আর লাল টিপে বেশ সুন্দর লাগছিল নীরা কে। এক ছুটেই পৌঁছাতে চেয়েছিল সায়েদ অর্থাৎ অভির বাড়ি। কিন্তু তা আর হল না। লক্ষী পূজোর দিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হল বাড়ির লক্ষীদের। করিমগঞ্জ এ হঠাৎই শুরু হয় হিন্দুদের ওপর অত্যাচার। শুরু হয় গনহত্যা।মেঘনা নদীর জল লাল হতে বেশি সময় লাগল না।জ্বালিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের পর গ্রাম। বাড়ির মেয়েরাও ছাড় পায়নি। নির্মম ভাবে শারিরীক অত্যাচারের সম্মুখিন হতে হয়েছে তাদের।নীরাও বাদ পড়েনি এ সব থেকে। লাল পাড় শাড়িতে সেজে ওঠা নীরার বুক থেকে এভাবে শাড়ি সরে যাবে তা হয়তো ওই বয়ষী মেয়েটার ধারনার বাইরে ছিল। সমগ্র একটা জাতি সারা রাত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে তাকে। নুতুন আর একটা দিনের সঙ্গে সঙ্গে চেনা মানুষটার কাছে নুতুন এক অচেনা আশা নিয়ে ছুটে যায় নীরা। একটু খানি চোখের পলক, বেআব্রু সমাজের মায়াবি এক ইতিহাস, ফুটি ফাটা মাঠের মতো ধু ধু শরীরে, রক্তমাখা হাসি আর এক রক্তিম আশায় শুষ্ক ঠোঁটে নীরা বলল- অভি দা, এর পরেও ভালোবাসবে আমায়? বিয়ে করবে? কিগো বলো……

নীরার কথা গুলো এক প্রকার ভাবিয়ে তুললো সায়েদ কে। সমাজের অসন্তোষ, জাত-ধর্ম সব কিছুই ভুলে রক্ত মাখা নীরার শরীরটাকে বুকে জড়িয়ে নেয় অভি। রাতের অন্ধকারে নীরা রেহাই পায়নি কিন্তু সান্যাল বাবু সমাজের এক জন গুনি ব্যাক্তি তাই হয়তো রেহায় পেয়েছেন তিনি, রেহায় পেয়েছে তার দালান কোঠা। বেশ কিছু দিনের জন্য ঘর বন্দি হয়ে যায় অচিন বাবু,নীরা সঙ্গে সায়েদ-ঝুমুর-হাফেজ মিঞা। হাফেজ মিঞা নিজে মুসলমান হলেও হিন্দুদের প্রতি এই অত্যাচার মেনে নেননি তিনি। সায়েদের সঙ্গে নীরার বিয়ে মেনে নেন কিন্তু ওই অবস্থায় ওই খানে বিয়ে কোনো ভাবে সম্ভব নয়। এক রাশ মেঘে যখন ভারতবর্ষের আকাশ ঢেকে আছে তখন আসে এক খুশির খবর।লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ঘোষনা করেন- ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ট ভারতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে।কিন্তু এত বড়ো খুশির খবরেও খুশি হতে পারেনি ভারতবাসী। গর্ভে এলো নতুন একটি দেশ, আর ভ্রুন অবস্থায় পালন হল তার জন্মদিন আস্ত গোটা একটা দেশ কে বার্থ ডে কেকের মতো কেটেই। সমগ্র গোটা একটা দেশ ধর্মের নিরিক্ষে ভাগ হয়ে যায় ভারত-পাকিস্থানে। পাকিস্থান হল মুসলিম রাষ্ট্র আর ভারত হিন্দু দের। ভিটে মাটি সব ছেড়ে অচেনা অজানা এক গন্ত্যবের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় কোটি কোটি মানুষ। সান্যাল বাবু ঠিক করেন তিনি কোলকাতা চলে আসবেন। এক আত্মীয় এর বাড়িতেই উঠবেন এখানে। র‌্যড়ক্লিফ সাহেবের নেতৃত্বে শুরু হয় সীমান্তের কাজ। দুই দেশের মধ্যে পারাপার হতে শুরু করে মানুষ। পারা পারের সময় ধর্মে ধর্মে শুরু হয় হয় দাঙ্গা। সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেই অভিরা পাড়ি দেয় কোলকাতার উদ্দেশ্যে। কোলকাতায় এসেই অভি নীরার বিয়ে। যদিও ব্যাপার টা খুবই কঠিন তাও সব কিছু লুকিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই শুরু করবে নতূন জীবন। কয়েকটা পোষাক,জমানো কিছু টাকা, মায়ের গয়না আর বেশ কিছু স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দেয় তারা করিমগঞ্জ থেকে কোলকাতা। মাঝ খানে অনেকটা পথ, হাজার সমস্যা আর একটা কাঁটাতার। পারা-পারের সময় হঠাৎই হলদিবাড়ি সীমানা লাগুয়া শুরু হয় দাঙ্গা আর লুঠপাঠ। হয়তো সান্যাল বাবুর একটাই ভুল বন্ধু মুসলিম হলেও তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা। বিক্ষুব্ধ হিন্দুরা হঠাৎই শুরু করে আক্রোমন, চালায় লুঠ-পাঠ। রাতের অন্ধকারে রক্তাক্ত অভির শরীরটা তখন কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাঁচতে চায় সে, ধর্ম নিয়ে নয়, এক জন মানুষ হয়ে, সামান্য কয়েকটা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চায় সে।মাথার ওপর স্বাধীন ভারতের পরাধীনতায় ভরা আকাশ, নীরার কোলে মাথা রাখা একটি জলজ্যান্ত রক্তাক্ত যুবক আর তার মুখ থেকে আধো স্বরে ভেসে ওঠা শেষ একটাই কথা “সাম্প্রদায়িকতায় মানুষ ধর্ষন হয়, প্রেম নয়, খুন হয় মানুষ তার সত্ত্বা নয়, কাঁটাতার ভাগ করে দেয় দুটো দেশ কিন্ত আকাশ তো একটাই, দেশকে ভাগ করে নয় আনন্দ ভাগ করেই দেশপ্রেমিক হওয়া যায়”।

Utsab Maity

আমি লেখার চেষ্টা করি। ভালোবেসে সব কিছুকে ভালোবাসি। "মন ও জীবন" নামক একটি NGO এর সঙ্গে যুক্ত আছি। মানুষকে ভালোবাসতে ও সাহায্য করতে ভালো লাগে। আমি সামান্য মানুষ, এই বেশ ভালো আছি।।

More Posts

Related posts

Leave a Comment