গল্পের মত সত্যি

people_children_mother_and_daughter___children_012815_
মেয়েটার বিয়ে বেরিয়ে গেল ফুলে সাজানো গাড়িটাতে ।বাড়িটা একেবারে শূন্য হয়ে গেল ।কবে যে ফুটফুটে পরীটা এত বড় হয়ে গেছে, বুঝতেই পারে নি কৌশিক ।সব কিছু মনে হচ্ছে এই ক’দিন আগের ঘটনা ।এই তো সেদিন দোলন আর মোমকে নিয়ে কলকাতা ছেড়ে এই পাহাড়ের দেশে চলে আসা, বরাবরের মত ।নিজের জন্য, দোলনের জন্যও – মোমকে অবলম্বন করে এলোমেলো হয়ে যাওয়া জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করার স্বপ্ন নিয়ে ।সেই ছোট্ট মোম আজ সব শূণ্য করে দিয়ে চলে গেল । আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়েছে বহু কাল ।এখানের কিছু লোকজনই ছিলেন নিমন্ত্রিত হিসেবে ।তারা সবাই চলে গেছে যে যার মতো । কৌশিক দোলনকে অনেকক্ষণ ধরে দেখেন নি ।হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরল – কোথায় গেল দোলন । মেয়েকে ঘিরেই ওর বেঁচে থাকা ।কে জানে, কিভাবে থাকবে মেয়েকে ছেড়ে । মোমের বিছানায় উপর হয়ে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে দোলন । কৌশিকের মনে পড়ে গেল চব্বিশ বছর আগের সেই দিনের কথা, যেদিন এই ভাবেই দোলন কেঁদেছিল – মোমের জন্য । দোলনের সাথে কৌশিকের আলাপ কলেজে, সেখানেই প্রেম।যদিও দোলন অনেক চেষ্টা করেছিল কৌশিককে ফিরিয়ে দেওয়ার । কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৌশিকের জেদের কাছে হার মেনেছিল ।কিন্তু দোলনের আশঙ্কা অমূলক ছিল না ।চাকরি পাওয়ার পর বাড়িতে জানাতেই শুরু হল চূড়ান্ত অশান্তি ।অনাথ আশ্রমে মানুষ হওয়া পিতৃ পরিচয়হীন মেয়ে দোলনকে বাড়ির বউ হিসেবে মানতে নারাজ কৌশিকের পরিবার ।অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল কৌশিক, কিন্তু বোঝাতে পারে নি ।অবশেষে বাড়ি ছেড়ে দোলনকে নিয়ে সংসার পাতে কৌশিক ।এক বছরের মাথায় ঘর আলো করে আসে মোম । আনন্দের বন্যা বয়ে নিয়ে আসে ছোট্ট পরীর মত মেয়েটা ।দোলন সারা দিন ওই মেয়েকে নিয়ে পড়ে থাকে ।কৌশিকেরও কেমন যেন, বুকের ভেতর একটা শিরশিরে অনুভূতি…. পিতৃত্বের অনুভূতি ।মোম মুখে আওয়াজ করছে, পাশ ফিরছে, বসতে পারছে – সব কিছু যেন এক একটা উৎসব মনে হত।হামা দিতে শিখে থেকে দোলনের কাজ ছিল মোমের পেছনে পেছনে সারা বাড়ি হামা দেওয়া ।কৌশিক হাসত মা মেয়ের কাণ্ড দেখে । সেদিন অফিস যাওয়ার খানিক পরেই ফোনটা গেছিল, বাড়িওয়ালা বৌদির থেকে ।মোম দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেছে নীচে ।সবাই হাসপাতালে নিয়ে গেছে ।পাগলের মত হাসপাতালে পৌঁছেছিল কৌশিক, কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ ।মোমের দেহটা নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিল কৌশিক দোলন তখন ঠিক এভাবেই কাঁদছিল। মোমের নিথর দেহটা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল দোলন ।দীর্ঘ সময় পর ডাক্তারের চেষ্টায় জ্ঞান ফিরেছিল দোলনের ।কেউ বিশ্বাস করাতে পারে নি যে মোম আর নেই ।বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছিল দোলন ।দিনের পর দিন মোমের সব কিছু আকড়ে মোমকে কল্পনা করে বেঁচেছিল দোলন ।অবশেষে সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শে একদিন যে অনাথ আশ্রমে দোলন বড় হয়েছিল সেখানে নিয়ে যায় কৌশিক ।সত্যি কাজ হয় ।ওখানের এক বাচ্চাকে মোম বলে কোলে দিতে দোলন তাই সত্যি বলে বিশ্বাস করে, মেনে নেয় ।তারপরই কৌশিক কলকাতা ছেড়ে চলে আসে, নতুন করে বাঁচার আশায় । আজও কৌশিক নির্মম সত্যি-টাকে আড়াল করে রেখেছে গল্পের মত সত্যি এক সুন্দর নিষ্পাপ সত্যি দিয়ে – আজীবন রাখবে আড়ালেই ।কিছু সত্যি মিথ্যার চেয়েও কালো, আবার কিছু মিথ্যা অন্ধকারে এক মুঠো আলো ।চোখের জলটুকু মুছে নেয় কৌশিক, মনে মনে প্রার্থনা করে দোলনের এই মাতৃত্বের কান্না যেন আর কখনও ঊষর মরুভূমি না হয়ে যায় ।
Sankhasathi Pal

Sankhasathi Pal

মফস্বল শহরের মেয়ে।পড়াশোনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে ।বর্তমানে মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষাদান জন্য প্রশিক্ষণরত।ভালো লাগে গান, সাহিত্য চর্চা এবং ফটোগ্রাফি ।

More Posts

Related posts

Leave a Comment