ঠিকানা

লাবণ্য নেই এ সংসারে প্রায় দু’বছর, তবু আজ সকালে যখন ফোনটা এল বৃদ্ধাশ্রম থেকে করবীর পায়ের নিচের মাটি সরে গেছিল ।লাবণ্য না থাকলে করবীর এই পৃথিবীতে আর কেউ থাকল না ।নিজের বাবা মা তো সেই কবেই চলে গেছে ।মানুষ হয়েছে দিদার কাছে ।লাবণ্য-ই তো করবীকে পছন্দ করেছিলেন, নিয়ে এসেছিলেন পুত্রবধূ করে ।সে তো কম দিন আগের কথা নয় ।তখন বাবা বেঁচে ছিলেন ।লাবণ্য-ই ছিলেন এই সংসারের সূর্য, তাকে কেন্দ্র করেই চলত রায় পরিবার ।মানসের-ও ক্ষমতা ছিল না মায়ের মুখের উপর কথা বলার । মা-মরা করবী মা পেয়েছিল লাবণ্যের মধ্যে ।শাশুড়ি সম্পর্কে শোনা চিরকালীন সমস্ত ভয় মিথ্যা হয়ে গেছিল লাবণ্যের স্নেহসুধায়।কত কিছু.. টুকিটাকি গল্প.. কত কত স্মৃতি….. ।। লাবণ্য মানসের মা, তবুও মানসের সাথে যা কিছু হয়েছে – সব মন খুলে লাবণ্যের কাছেই বলেছে করবী, বরাবর। সব বদলে গেছিল বাবা মারা যাবার পর ।তখন ছ’মাসও হয় নি বাবা মারা যাবার, মানস বাড়িটা বিক্রি করে এই ফ্ল্যাটে চলে আসে ।এত বছরের স্মৃতি জড়ানো বাড়ি – কাউকে না জানিয়ে বিক্রি করে দিল মানস ।তারপর থেকে করবীর ওপর চলত অকথ্য অত্যাচার ।করবীর দোষ ছিল, সে বিয়ের বারো বছরের মধ্যে কোনো সন্তান জন্ম দিতে পারে নি।মানসের সমস্ত অত্যাচার থেকে করবীকে বুক দিয়ে আগলে রাখতে চাইত লাবণ্য।হয়ত পারত না, তবু চেষ্টা করে যেত।একদিন লাবণ্যই করবীকে বলেছিল সেই সত্য, যা গোপন রাখার প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছিল করবীকে ।মানস লাবণ্যর সন্তান নয়।মানসকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনি ।অবাক হয়ে গেছিল সেদিন করবী।লাবণ্যের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে এসেছিল করবীর। তার কিছু দিন পরেই লাবণ্যকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয় মানস ।করবীর উপস্থিতিতেই নিয়ে আসতে শুরু করে নিত্য নতুন নারী সঙ্গিনী এভাবেই চলতে থাকে দিনের পর দিন ।মাঝে মাঝে করবী দেখা করতে যেত লাবণ্যের সাথে ।করবী কিছু না বললেও কি জানি কি করে সবটুকু কষ্ট বুঝে যেত লাবণ্য । বৃদ্ধাশ্রমের মিতাদির ডাকে ঘোর কাটল করবীর ।লাবণ্যের চিতার আগুন তখন প্রায় নিভে গেছে ।শেষ ধোঁয়াটুকু যেন করবীকে আশীর্বাদ করে যাচ্ছে ।হ্যাঁ, করবী খবর দেয় নি মানসকে, অপেক্ষা করে নি মানসের জন্য – নিজেই করেছে লাবণ্যের মুখাগ্নি ।সে জানে, এর ফল ভালো হবে না ।হয়ত মানসের ফ্ল্যাটে আর জায়গা হবে না করবীর।জায়গা সে আর চায়ও না ।মিতাদি বলছে, লাবণ্য কিছু টাকা রেখে গেছেন ।আর করবীর আছে কিছু গয়না ।সেই টাকায় করবী চলে আসবে বৃদ্ধাশ্রমে, লাবণ্যের ফেলে যাওয়া ঘরে । করবীর মাথাটা যেন চক্কর দিচ্ছে, তবু সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে।এতদিনে সে বুঝতে পারছে সম্পর্কের মানে।হেঁটে তাকে যেতেই হবে, পৌঁছাতে হবে শান্তির ঠিকানায়।
Sankhasathi Pal

Sankhasathi Pal

মফস্বল শহরের মেয়ে।পড়াশোনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে ।বর্তমানে মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষাদান জন্য প্রশিক্ষণরত।ভালো লাগে গান, সাহিত্য চর্চা এবং ফটোগ্রাফি ।

More Posts

Related posts

Leave a Comment