দীপ্তেন্দুকে

20130618-finding-love

 

দীপ্তেন্দু,
জানি তোমাকে না জানিয়ে এসেছি বলে এক আকাশ অভিমান জমে আছে তোমার সমস্ত শরীর মন জুড়ে , কিন্তু এও জানি তুমি পারবে না আমার ওপর অভিমান করে থাকতে । এতোদিনের এতো দুঃসাহসের ভালোবাসায় এটুকু আমি নিশ্চিতভাবেই জেনেছি , বহমান রক্ত যেমন আপনস্রোতে ভেসে যাবে প্রাণস্পন্দন থাকা অবধি , তুমি আমাতেই এসে মিশবে হাজার হাজার অভিমানের পরেও , হাজার হাজার মাইল দুরত্ব অতিক্রম করেও । এই বিশ্বাস-ই তো আমাদের ভালোবাসা – তাই না দীপ্ত ।
কংক্রিটের জঙ্গল আর সেই জঙ্গলের বনমানুষের ( তথাকথিত সামাজিক ভাষায় সুসভ্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিগণ ) মাঝে থাকতে থাকতে নিজেকেই ভীষণ অচেনা লাগছিল আজকাল । ঘরের আয়নাটাকে খুঁজে পেলেও বিবেকের আয়না- অন্তরের অন্দরমহলের আয়নাটাকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না আজকাল । মাঝে মাত্র কয়েকটা মাস , অথচ এরমধ্যেই জীবনের চাওয়া-পাওয়ার তালিকাটা যেন পুরো বদলে গিয়েছে । মাত্র পাঁচমাসেই আমাকে কল্লোলিনী কলকাতার সমস্ত টান ভুলিয়ে দিয়েছে এই ছোট্ট পাহাড়িয়া গ্রাম তবা কোশী ।
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে আমার মিরিক হয়ে গেছিলাম মনে আছে নিশ্চই মনে আছে তোমার । মিরিক থেকে মাত্র 8 কিমি দূরে সবুজে সবুজে ঘেরা ছোট একটা গ্রাম । যদিও মিরিকের থেকে নীচুতে এর অবস্থান । পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে ওপরে উঠলে নেপাল বর্ডার দেখা যায় ।ঠান্ডাও মন্দ না । স্বপ্ন যেন কুয়াশা মাখা ভোরের আলোর পথ বেয়ে পৃথিবীতে নেমে এসেছে তবা কোশীতে ।
তুমি তো জানোই পাহাড় আমার  ব-ড-ডো প্রিয় । সেই পাহাড়ের কোলে খুঁজতে গেলাম নিজেকে ।যদি খুঁজে পাই আমার শেষ ঠিকানা —- আমাদের শেষ ঠিকানা ।
স্বর্ণালীকে চিনবে না তুমি , আমার স্কুলের বন্ধু । বহুদিন পর মেট্রোতে দেখা।সেদিন ই কথায় কথায় বলেছিল কথাটা । ওর মামার তিনটে চাবাগান আছে তবাকোশীতে । প্রায় 200 জন শ্রমিক কাজ করে সেখানে , অথচ  কোন ডাক্তার নেই । সভ্য বনমানুষের কেউ ওখানে থাকতে রাজি নয় । ওই আমাকে বলেছিল কেউ রাজি থাকলে একটু চেষ্টা করতে । আমি ওখানে গিয়ে থাকতে পারি এটা হয়ত ভাবতেও পারেনি , তাই প্রস্তাবটা আমাকে দেয়নি । উপযাচক হয়ে আমিই ওকে প্রস্তাবটা দিয়েছিলাম ।
এরা  তবাকোশীতে আমাকে থাকতে দিয়েছে । গোপালধারা চা বাগানে মঙ্গলবার আর শনিবার আমাকে এখানে রুগী দেখতে হয় । বুধ-বৃহস্পতিবার যেতে হয় একটু ওপরের গ্রাম শঙ্খমনের মাংগারজাং চা বাগানে । শুক্রবার আর রবিবার  যাই টুকরেতে । রবিবার চাপাতা তোলার কাজ বন্ধ থাকে । তাই সোমবার সব কারখানা বন্ধ আর তাই আমারো ছুটি । আমার ছোট্ট বাড়ির সামনে একটা ছোট বারান্দা আছে । সামনে একটা একফালি বাগান আছে , সেখানে যে কত রঙবেরঙের ফুল ফুটেছে না দেখলে বিশ্বাস করবে না তুমি । রাতে বারান্দাতে এসে বসি , হাওয়ায় ভেসে আসে রামভাঙ নদীর শীতল স্পর্শ হাজারো বুনো ফুলের গন্ধ মেখে । পূর্ণিমার  রাতে আকাশ থেকে “দীপ্ত ইন্দু” আলোর সিঁড়ি বেয়ে ঝুপ করে নেমে আসে আমার কাছে , যেন ছুঁয়ে যায় আমার সমস্ত স্বত্ত্বা । আমি তৃপ্ত হই ধন্য হই ।  সমস্ত আবেগে , চরম পুলকে , খুঁজে পাই আমার দীপ্তেন্দুকে । অমাবস্যায় থাকি একা অপেক্ষায় থাকি , এরপর পনেরদিন লুকোচুরি খেলা । এ এক অদ্ভুত প্রেম ।
তোমায় ভুলতে বা তোমায় আমাকে ভোলাতে তোমাকে ছেড়ে আসিনি । এসেছিলাম এখানে নিজেকে খুঁজে পেতে , আর নিজেকে খুঁজে পেয়েছি । রামভাঙ নদীর স্রোতে তাসিফুলের গন্ধে চিরদুঃখী পাহাড়ি মানুষগুলোর অকৃত্রিম আত্মীয়তা আর অনাবিল হাসিতে আমি খুঁজে পেয়েছি নিজেকে ।
আর হয়তো কোনদিন আমার ফেরা হবে না । এদের ছেড়ে যেতে আমি পারবো না । এদের আমাকে কতোটা দরকার আমি জানি না ,কিন্তু আমার এদের বড় দরকার । প্রকৃতি এদের জনূয ওষুধের পসার সাজিয়ে রেখেছে , আমার ওষুধ না হলেও এরা বাঁচবে।তুমি জানলে অবাক হবে এখানে একরকমের গাছ আছে – দেখতে অনেকটা পার্থেনিয়াম গাছের মতো-তিতাপাতি নামে পরিচিত-যার রস অত্যন্ত দ্রুততায় রক্তচাপ কমিয়ে দেয়।আরো আছে পাহাড়ি আমলকী-মাটির ওপরে নয় , নীচে থাকে ফল-যার রস মেটায় তৃষ্ণার্ত পথিকের তৃষ্ণা । আরো যে কতো এমন উপকারি গাছ আছে , যা আমাদের পুঁথিগত বিজ্ঞানকে অবাক করে দেয় । ওরা যখন ওরা আমার জন্য নদীতে পাওয়া আসলা মাছ এনে দেয় । আমি কোথাও গেলে আমার যাত্রা শুভ ও বিপদ্মুক্ত হবার কামনায় আমার ডানকানে তিতাপাতি গাছের পাতা খুঁজে দেয় তখন এদের অকৃত্রিম অনাবিল ভালোবাসার দানে কৃতার্থ হয়ে যাই । আমি ওদের কাছে ঋণী ।আর সেই ঋণের দায়েই এখানে থেকে যেতে চাই সমস্ত জীবন ।
আশা করি তুমি জানো , তোমাকে মনে করানোর কোন দরকার নেই , তবুও বলি , আমার বাড়ির-মনের-শরীরের-জীবনের সমস্ত দরজা চিরদিনের মত তোমার জন্য উন্মুক্ত ছিল , আছে থাকবেও । জীবনে চলতে চলতে যখন যেদিন তুমি হাঁফিয়ে উঠবে , বিশ্রাম চাইবে , পৌঁছাতে চাইবে ,সেই চিরপিপাসিত আমাদের শেষ ঠিকানায় । সেইদিন এসো আমার কাছে এই স্বর্গের মতো সুন্দর তবাকোশীতে ।
তুমি আর আমি দুজনে মিলে প্রকৃতির এই অমৃতসুধা পান করে নেশায় বুঁদ হয়ে নবরূপে আবিষ্কার করব দুজন দুজনকে । পাহাড়ের ধাপে ধাপেধাপে সবুজের আলিঙ্গনে , নাম-না-জানা নদীর স্রোতে , কর্বুর ফুলের মাঝে-নতুন জীবন খুঁজে পাবো । অভ্যাস-খ্যাতি-পরিচিতি-অর্থ-বৈভব সমস্ত কিছুর দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নবজন্ম হবে তোমার । তাসিগাছের নীচে ফলসা বরণ তাসি গাছের নীচে আমাদের ফুলশয্যা । জ্যোৎস্না মাখা রাত গায়ে মেখে দুজনে ঠিক চলে যাবো স্বপ্নের দেশে ।
ভালোবাসা কোন খাদ্যবস্তু না আর মানুষের মনটাও কোন রেফ্রিরেজাটার নয় । তাই কোন চিন্তা করো না , তুমি যত দেরিই করো না আমাকে খুঁজে পেতে , তোমার জন্য আমার মনে সঞ্চিত ভালোবাসা কখনো কোনদিন বাসি হবে না । জীবনের সমস্ত অলিগলি-রাজপথ পেরিয়ে তোমাকে হাজির হতেই হবে এই ভালোবাসৃর কুঁড়েঘরে । তোমাকে লেখা এই চিঠি তো আমি কোন ডাকঘরে জমা করব না , কোনো মানুষ এই চিঠি বয়ে নিয়ে যাবে না তোমার কাছে । এই চিঠি আমি সযত্নে অনেক আদর মাখিয়ে ভাসিয়ে দেব রামভাঙ নদীর স্বচ্ছ সুন্দর পবিত্র জলধারায় অনেক পথ পেরিয়ে কোনো এক মনখারাপের বিকালে তোমার কাছে আমার অস্তিত্বকে পৌঁছে দেবে ঠিক ।
ভালোবাসা কি লিখে জানাতে হবে তোমায় , যেমন লোকে লোকে জানায় চিঠিতে?আমি তো আমার ভালোবাসা বিছিয়ে দিলাম তোমার আসার পথে , যে পথ একদিন তোমাকে পৌঁছে দেবে আমার কাছে । অপেক্ষাতে থাকবো ।
   —–  ইতি  তোমার শ্রী
stained-glass-love-hands-1
Sankhasathi Pal

Sankhasathi Pal

মফস্বল শহরের মেয়ে।পড়াশোনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে ।বর্তমানে মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষাদান জন্য প্রশিক্ষণরত।ভালো লাগে গান, সাহিত্য চর্চা এবং ফটোগ্রাফি ।

More Posts

Related posts

Leave a Comment