রূপবা

২০১৬-তে আহমাদাবাদে একটা কাজে শর্ট ট্যুরে গিয়ে এদিক ওদিক টুরিস্ট স্পটগুলো ঘুরে নিচ্ছিলাম আরকি। তখনই যাই “আদলাজ ভাভে”, একটা স্টেপ-ওয়েল। যাওয়ার পথেই স্বভাবসিদ্ধভাবে যেখানে যাচ্ছি সেই জায়গাটা সম্পর্কে একটু খোঁজাখুঁজি করছিলাম। তবে নেটের ঝামেলায় কোনো পেইজই ওপেন হলো না। ভাভে গিয়ে কেন জানিনা মনটা খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছিল বারেবারে। এদিকে ফিরে আসতে মন চাইছিল না। হোটেলে ফিরে এসে সেদিন এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। পরদিন ঘুম ভাঙ্গতেই খুব কান্না পাচ্ছিল। কারণ বুঝতে কিছুটা সময় লাগল। রাতের দেখা স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল। এর কদিন পরে বাড়ি ফিরে এসে ক্যামেরা থেকে ফটোগুলো ল্যাপটপে নেওয়ার সময় মনে হলো “আদলাজ ভাভের” হিস্ট্রিটা তো পড়াই হলোনা। সাথে সাথে গুগুল সার্চ করে আদলাজ ভাভের হিস্ট্রি আর লিজেন্ডসটা পড়লাম। জানিনা কিভাবে এর ব্যাখ্যা খুঁজব বা অলৌকিক আখ্যা দেবো। বিনা তথ্যে কিভাবে আর কেনই বা সেদিন দেখেছিলাম স্বপ্নটা আজও কোনো ব্যাখ্যা পাই না। বিশ্বাস করুন, আজও মন পরে আছে ওই ভাভে। আর কখনো ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে শিগগিরি যাবো আবার। এবার নতুন চোখে দেখব “রুপবা আর রাণার ভাভ” -কে। নিজের মতো করে সেই স্বপ্নটা আগে শোনাই আসুন আপনাদের।

ডন্ডাই দেশ। পন্ডিতদের ছন্দবদ্ধ মন্ত্র উচ্চারন উত্তপ্ত বাতাসকে যেন মৃদু হতে আহ্বান জানিয়ে চলেছে। ভূমি আর আকাশ আজ নিজেদের তীব্র উত্তাপ বিনিময় করে চলেছে একে ওপরকে অথচ দেশ জুড়ে উৎসবে মেতেছে সকলে। আজ তাদের রাজা ফের তাদের কিছু উপহার দিতে চলেছেন। যজ্ঞ চাতাল ঘিরে বসে রয়েছে আবালবৃদ্ধবনিতা ডন্ডাইবাসী। সকলে তাকিয়ে তেজস্বী নবদম্পতির দিকে। এক বৃদ্ধা দুহাত তুলে আশীর্বাদ করলেন নব-দম্পতি ডন্ডাই রাজারানীকে। শুষ্ক ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠল কিছুটা। আমি জানি, সকল ডন্ডাইবাসী সেদিন একইভাবে আশীর্বাদ ও মঙ্গল কামনা করে চলেছিল। সে আশীর্বাদের আভা যেন ঠিকরে পরছে, যজ্ঞরত নবদম্পতির চারপাশে। যজ্ঞ শেষে যখন রাজা ও রানী উঠে দাঁড়ালেন আকাশে তখন বজ্রগর্ভ মেঘ ছেয়ে আসছে… পুরোহিতেরা ঈশ্বরকে প্রণাম করে রাজার স্তুতি গেয়ে বললেন, “আজ ঈশ্বর ও আমাদের নরেশ্বর উভয়এই ডন্ডাইবাসীকে প্রাণরস উপহার দিতে চলেছেন”। স্মিত হেসে এগিয়ে এসে, ভাভ (কূপ) এর খনন ক্রীয়ার শুভসূচনা করলেন রাজা নিজহাতে। ডন্ডাই দেশের আকাশ গর্জে উঠল জয়ধ্বনিতে… “রাণা  ভীর সিং এর জয়”… “রানী রূপবা এর জয়”।

রাণা তার রানী রূপবার চোখে চোখ রেখে ফিরে গেলেন কদিন আগের ফেলা আসা সেই অস্তরাগের ক্ষণে…

#

পরন্ত বিকেলের কনেদেখা আলোয় যেন নতুন করে দেখছেন তখন রাণা তার রাণীকে। রাণী রূপবা তখন একমনে তার কোলের ময়ুরটির সাথে খেলা করে চলেছে। ময়ুরের পেখমের মাঝে মাঝে ঢাকা পরে যাচ্ছে, রানীর মুখ। তাদের অজান্তে, রাণা ভীর সেই খেলায় অংশ নিয়েছেন। রূপবতি রাণী যেন ময়ুরপুচ্ছের আড়াল থেকে আরো রূপসী হয়ে উঠছেন। কি অপরূপ সেই দৃশ্য… এখনও বড় শিশুসুলভ তার রাণী… বড় চঞ্চল।

হঠাৎ-ই অন্যমনস্ক হয়ে পরলেন রাণা। মহম্মদ বাগাদা একে একে গ্রাস করে চলেছে একের পর এক দেশ… শীঘ্রই হয়তো রনসাজে সাজতে হবে ডন্ডাইকেও। ডন্ডাই এর বীর সৈন্যদের মনোবল দৃঢ় হচ্ছে মহম্মদ বাগাদা যত এগিয়ে আসছে ডন্ডাই এর দিকে… কিন্তু বাগাদা এর বিপুল সৈন্য এর সাথে শুধু মনোবলে কতদিন আগলে রাখবেন রাণা, ডন্ডাই কে? তার অবর্তমানে, রাণী রূপবা কিভাবে রক্ষা করবেন প্রজাদের? মহম্মদ বাগাদা এগিয়ে আসছে… এই দেশ, দেশের মানুষ আর… আর রূপবা…?

কপালে কোমল স্পর্শে চোখ খুললেন রাণা…

– এই পরন্ত বিকালের একান্তে, রাণা ভীর সিং এর কপালে এই ভাজগুলি কেন? এর কারণ কিভাবে জানতে পারবে রাণী রূপবা?

– রূপবা…

– হুঁ…

(রাণা কিছু বলতে গিয়েও সামলে নিলেন নিজেকে… রাণী রূপবার মন এখনও শিশুর মতো কোমল, রাজনীতি, কূটনীতি থেকে ক্রোশ ক্রোশ দূরে সে মন)…

– রূপবা…

– হুঁ…?

– সামনে বড় দুশ্চিন্তা… অনাবৃষ্টিতে জলকষ্ট বেরেই চলেছে… আর আমাদের মাতৃভূমি, আমার দেশমাতা যে তার সমস্ত মমতা নিজের বক্ষের অনেক গভীরে লুকিয়ে রাখেন। আমি সেই মায়েরই সন্তান, তিনি সকলের লাললের গুরুদ্বায়িত্ব যখন আমার হাতে দিয়েছেন তখন আমি কিভাবে চোখের সামনে দেখতে পারি আমার দেশের মানুষের এই কষ্ট… তাই স্থাপত্যবীদদের সাথে সভা করব ভাবছি… একটি ভাভ গড়তে চাই। আমার দেশের জন্য, আমার দেশের মানুষের জন্য… এমন একটা ভাভ…

রাণা একমনে বলে চলেছিলেন, রূপবার দিকে এবার চোখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করলেন…

– বলতো দেখি, আমার সবথেকে প্রিয় কি?

দুটো টলটলে ঝিল নিয়ে রাণার চোখে চোখ রাখল রাণী রূপবা…

– ডন্ডাই দেশ।

রাণা ভীর সিং হেসে উঠলেন।

– এই পরন্ত বিকালের একান্তে, এমন প্রশ্নের উত্তরে রাণী রূপবার এই উত্তর কি অভিমান এর?

ঝিলদুটি নামিয়ে নিয়ে রূপবা রাণার বুকে মাথা রাখলেন…

– অহংকারের…

রাণার মুখে তেজ ফুটে উঠল, তার প্রিয় রাণী অতটাও শিশুসুলভ নয় তাহলে। রূপবার নিকষ কালো কেশরাশিতে আঙ্গুল ডুবিয়ে দিলেন রানা। একে অপরের হৃদধ্বনি অনুভব করছেন দুজনেই…

– জানো রূপবা আমি এমন একটা ভাভ গড়তে চাই, যার গভীরতা দিয়ে আমি দেশমায়ের বুকের শীতলায় আশ্রয় নিতে চাই আর যার সৌধের উচ্চতা দিয়ে রাণা আর রূপবার ভালবাসার মর্যদা ধরে রাখতে চাই। তার সিঁড়ির প্রতিটা পদ সাক্ষী দেবে ডন্ডাই এর ইতিহাসের। ভাভের স্তম্ভ হবে ডন্ডাই দেশের দৃঢ়তার প্রতিক, যেই ভাভের আট দেওয়াল ঘিরে রাখবে আমার দেশের মানুষের প্রাণের-রস। যুগ-যুগ ধরে এই ভাভ স্মারক হয়ে থাকবে ডন্ডাই দেশের, স্মারক হয়ে থাকবে রাণা আর রূপবার প্রেমের…

++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++

আজকের পরন্ত বিকালটা বড্ড বেশি নিস্তব্ধ। শেষ সূর্যের আভায় আরও ম্লান দেখাচ্ছে রাণী রূপবাকে। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠীতে লেগে রয়েছে বিজয়তিলকের কুমকুম, যা তিনি এঁকে দিয়েছিলেন রাজার ললাটে। ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছে কড়া আর নুপুরের আওয়াজ। রুপবার পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পরে ফুঁপিয়ে উঠল তার প্রানের সখী। রানীর মুখে যন্ত্রণার রেখা ফুটে উঠেও মিলিয়ে গেল। কিছু পরেই, আকাশের প্রথম তারাটির সাথে সাথে আবির্ভাব হল ডন্ডাইয়ের রাজদূতের, সাথে রয়েছে মহম্মদ বাগদার বার্তাবাহক। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বার্তাবাহক নিজের সাথে নিয়ে আসা বার্তাটি পড়তে শুরু করল। খুব সংক্ষিপ্ত সেই বার্তা- “মহম্মদ বাগদা রাণী রুপবার পাণিগ্রহণে ইচ্ছুক। বিনা বাধায় রানীর সম্মতি শুধু রানীই নয় তার প্রজাদেরও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার একমাত্র চাবিকাঠি”। হাতের ইশারায় রাণী দূতকে ফিরে যেতে নির্দেশ দিলেন। বাগদার বার্তাবাহককে রাণী তার সামান্য শর্তসাপেক্ষ সম্মতি জানিয়ে বিদায় দিলেন। সকলে চলে গেলে ধীর পায়ে এগিয়ে রূপবা তার খুব প্রিয় লাল ওড়নীতে মুছে রাখল রাণা ভীর সিং-কে শেষবারের মতো ছুঁয়ে আসা কুমকুম।

+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++

রুপবাকে নিজের চোখে দেখেছেন তিনি, তবে আজই সেই দিন যেইদিন রুপবাকে সম্পূর্ণরূপে নিজের করে পেতে চলেছেন মহম্মদ বাগদা। এতো সহজে মামুলি এক শর্তের পরিবর্তে যে রাণী তার প্রস্তাব মেনে নেবে এ বাগদা আশা করেননি ঠিকই, “একটা মামুলি কুপের নির্মাণ মাত্র”। হাহাহা… অট্টহাসিতে ফেটে পরলেন বাগদা। তবে রানীর এই সহজ আত্মসমর্পণ মহম্মদ বাগদাকে কিছুটা হলেও তার প্রতাপ আর পৌরষত্বের অহংকারকে কয়েক সোপান এগিয়ে দিয়েছে তা নিশ্চিত।

নব নির্মিত কূপের সামনে অপেক্ষারত মহম্মদ বাগদা ও তার নিকট অনুচরেরা। পালকি থেকে নেমে এলেন রাণী রুপবা। রানীর সখি আজ তাকে নতুন কনের বেশে সাজিয়েছে। রানীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বজ্র কণ্ঠে মহম্মদ বাগদা বলে উঠল, “দেখো রাণী, তুমি ঠিক যেমনটা চেয়েছিল ঠিক তেমনটাই বনেছে তোমার ভাভ। এই শুষ্ক বাঞ্জার মাটির বুক চিরে কি সুন্দর জল টেনে বের করেছে দেখ আমার আদমীরা। তোমার এক মামুলি ইচ্ছাকে মুঘল শিল্প আর বাগদার গৌরব কি দারুণ স্থাপত্যের আকারই না দিয়েছে”। নিশ্চল পলকে এক অভূতপূর্ব দীপ্তি নিয়ে রাণী এগিয়ে আসছে ভাভটিকে নিজের চোখে দেখতে। নিজের জয় আর দাম্ভিকতা ঝরে পরছে বাগদার কণ্ঠস্বরে। তবে রানীর দৃষ্টি আর ভাভের প্রতিটি স্তম্ভে আছাড় খেয়ে সেই কণ্ঠস্বরকে বড় নড়বরে শোনাল যেন বাগদার নিজের কানেই।

রুপবা চোখ ভরে দেখে নিচ্ছে তার কাঙ্ক্ষিত ভাভ। প্রতিটা খাঁজ, প্রতিটা গভীরতা, প্রতিটা উচ্চতা। চোখ বুজে নিল রুপবা। দু ফোঁটা নোনা জল যেন মিশে গেল ভাভের জলে। রুপবার প্রাণের সখীর আর্ত-চিৎকারে আর তার প্রতিধ্বনিতে কুঁকড়ে গেল মহম্মদ বাগদা। ভাভের পূর্ব খিলানের মেঝেতে পরে রইল রুপবার লাল ওরনী, রাণী রুপবা ও রাণা ভীর সিং-এর শেষ ছোঁয়া কুমকুমের সাক্ষ্য নিয়ে।

বিদ্রঃ না, “পদ্মাবত” থেকে ইন্সপায়ার্ড না। আমার আহমেদাবাদ ট্যুর ২০১৬ সালের ঘটনা। (পরে গুগুলে যা পেয়েছিলাম) আহমেদাবাদ সিটি থেকে ১৮.৬ কিমি দুরে অবস্থিত এই স্টেপ-ওয়েল। বর্তমানে যা “আদলাজ স্টেপ-ওয়েল” নামে পরিচিত। ১৪৯৮ খ্রীষ্টাব্দে রাজা ভীর সিং এর ভিত রাখেন কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি মুঘল রাজা মহম্মদ বাগদার হাতে যুদ্ধে প্রাণ হারান। ১৪৯৯-এ মহম্মদ বাগদা এই ভাভ বা কূপটির নির্মাণ শেষ করেন। ফলে এই ভাভ বা স্টেপ-ওয়েলটিতে ইন্দো-ইস্লামিক স্থাপত্যশৈলী দেখতে পাওয়া যায়। এবং রানী রূপবাকে বিবাহ করতে চাইলে, রানী ঐ কূপেই আত্মহত্যা করেন।

 

Anindita Dutta Sinha

আমি ভালবাসাকে ভালবাসি... আমি জীবনকে ভালবাসি। পেশায়, ফ্রিলাইন্সার গ্রাফিক ডিসাইনার। আমার আমিটার জন্য যেটুকু সময় পাই, চেষ্টা করি টুকরো কিছু ভাবনা আর ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকে সাজিয়ে এক-একটা ছবি আঁকাতে। উইশস্ক্রিপ্ট-এর সাথে যুক্ত হওয়ার আহ্বান পেয়ে খুবই ভাললাগছে। অনেক শুভেচ্ছার সাথে , অনিন্দিতা

More Posts

Related posts

Leave a Comment