শিকড়

মরতে গিয়েও মরতে পারিনি। আমি মরে গেলে মৌসুমী আর মেয়েটা ভেসে যাবে। ওদের মুখে হাসি ফোটানোর সামর্থ্য নেই আমার, তাই বলে নিজে পালিয়ে গিয়ে ওদের অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ছুঁড়ে ফেলি কী করে…আমি তথাগত সেন। সামান্য এক সেলসম্যান। চারদিক থেকে দেনার দায়ে ডুবে আছি। কাল হয়তো চাকরিটাও থাকবে না। ঘরে ফিরে মৌসুমীকে কি বলব জানিনা। ও বরাবরই চুপচাপ। কোন অভিযোগ নেই ওর। কিন্তু আমাদের মেয়েটার ভবিষ্যৎ চিন্তায় ওকে আজকাল খুব রুগ্ন দেখায়।

দিলীপ দার কথামতো সেদিন এক জ্যোতিষীর কাছেও গেছিলাম। সে যা সব পাথর ধারণ করতে বলল, তা কেনার ক্ষমতাও আমার নেই। পাথর তো কোন দূর একটা আংটিও যদি থাকত তবে তা বেচেই কদিনের চিন্তা দূর করতাম। কথাগুলো বলাতে সেই জ‍্যোতিষী একটা কাগজে দুটো শিকড়ের নাম লিখে দিয়েছিল। বলেছিল আপাতত এগুলোই ধারণ করতে। সাত দিন পর পর চেন্জ করে করে পরতে হবে। চাকরির চিন্তায় বেমালুম ভুলেই ছিলাম। আজকে প্ল্যাটফর্মের শেষটায় ওই শিকড় নিয়ে বসে থাকা লোকটাকে দেখে হঠাৎ মনে পরল। ভাবছি নেব কিনা। মরতেই তো এসেছিলাম রেললাইনে তা যখন আর হলো না তখন আরেকটা জুয়া খেলেই যাই।

– দেখুন তো এই শিকড়দুটো হবে?

অতিরিক্ত ঢোলা নোংরা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে কুঁকড়ে বসে আছে লোকটা। আমি কাগজ এগিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আজব লোক তো! যেন স্ট্যাচু হয়ে গেল। মনেহচ্ছে একটা টোকা মারলে পড়ে যাবে।

“ধুস… অতো নখরা পোষায় না।” কাগজটা সরিয়ে চলে আসতে যাব, দেখি বস্তার চাপা সরিয়ে দুটো শিকড় এগিয়ে দিল।

গা টা শিরশির করে উঠল। পাকানো নারকেলের দড়ির মতো আঙুল আর তাতে নোংরা খয়েরি নখ। মুখ না তুলেই পাঁচটা আঙ্গুল দেখিয়ে দাম চেয়ে নিলো। ১০ টাকার ভাঙ্গতিও নাকি নেই ওর কাছে।

লটারির দোকানের ছোকরাটাও সুজোগ বুঝে ৫ টাকার লটারি কিনিয়ে নিল।

******************************************************************

প্রথম প্রথম বিশ্বাস করতে পারতাম না, দুটো শিকড় মানুষের ভাগ্য ফেরাতে পারে কখনো?

না চাকরিটা বাঁচাতে পারিনি ঠিকই, তবে শিকড়টা পরার তিনদিন পরে ৫০ হাজার টাকার লটারিটা পেয়ে যাই। এরপর থেকে যতবারই শিকড় কিনে পাল্টে পাল্টে পরেছি, প্রতিবারই যেন অপ্রত্যাশিতভাবে ছোট বড় সৌভাগ্যের মুখ দেখেছি। মৌসুমীর অকৃতদার মামা মারা যাওয়ার আগে আমাদের নামে তার বসতবাড়িটি লিখে দিয়ে যান। আমরা ওপর তলাটায় থাকি আর নিচে ব্লাউজ তৈরির ব্যবসা করছি মৌসুমী আর আমি। তবে সেটা ছিল শুরু।

ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় আমার সেই ব্যবসা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমাদের মেয়ের নামেই শাড়ির নতুন একটা বুটিক খুলেছি, “অনন্যা”। দুটো বাড়ি, দুটো গাড়ি রয়েছে। এবছরই কলকাতার সবথেকে নামি স্কুলে দিয়েছি মেয়েকে। ফি-বছরে নিয়ম করে একটা ফ্যামিলি ট্যুর করি। নেক্সটবারে ভাবছি একেবারে বিদেশে কোনো ট্যুরপ্ল্যান করে তাকে লাগিয়ে দেব মৌসুমীকে।

ভাবছি এখন শিকড়গুলো পরা বন্ধ করে দেব। কালই নতুন আঙটি দুটো দিয়ে গেছে স্যাকরা।

******************************************************************

– বাবু, সেই বুড়োটা আবার এসেছে। কিছুতেই যায়না আজ।

আচ্ছা জ্বালাতন তো। যেদিন থেকে শিকড় নেওয়া বন্ধ করেছি সেইদিন থেকে গেটের কাছে এসে বসে থাকছে বুড়োটা। বাড়ির ঠিকানা পেল কিভাবে কে জানে। আজ একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।

জানুয়ারির সন্ধ্যে। বেশ ঠান্ডা বাইরে। দেখি গেটের কাছে সেই এক ভঙ্গিতে জবুথবু হয়ে বসে আছে বুড়োটা। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দুটি শিকড় এগিয়ে আরেক হাতে ৫ টা শীর্ণ আঙুল বাড়িয়ে দিল।

– আর কতবার বলব তোমায়, আর লাগবেনা আমার এখন এই শিকড় বাকড়।

এদেখি আজব জ্বালা, সে আবার তার স্ট্যাচু অবতার নিল। বেশ খানিকক্ষণ তাকে বোঝাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে “ধুত্তেরি” বলে পেছন ফিরতেই মনে হল কিছু একটা নড়ে উঠল। পিছন ফিরতেই বেজায় চমকে উঠেছিলাম প্রথমে। ওই জবুথবু হয়ে বসে থাকা বুড়ো দাঁড়ালে যে এতোটা লম্বা হতে পারে তার ধারণা ছিল না আমার।

– এইটা শেষবারের মতো।

কথাগুলো এতটাই আস্তে যে খুব কষ্ট করে বুঝে নিতে হল। এতে যদি আপদ বিদায় হয়, তাই নিয়ে নিলাম। পকেট থেকে টাকা বার করে দিতে যাব…

– এবারের টা ফিরি…

এমন হলুদ চোখ কোন মানুষের হতে পারে! এই এতো বছরে বুড়োটাকে না দাঁড়াতে দেখেছি, না তার গলা শুনেছি, না সে কোনোদিন চোখ তুলে চেয়েছে। আজ হয়তো সব একসাথে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেছি। অত বয়স্ক গরিব মানুষ, হয়তো জন্ডিস টইন্ডিসে ভুগছে। খারাপও লাগছিল পরে। পরদিন সকালে স্নান সেরে অভ্যাসমতো নতুন শিকড়টা পরে নিলাম।

******************************************************************

প্রথম দিকে শীতের প্রকোপ মনে করে অনেক রকম লোশন, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করছিলাম, কিন্তু ওতে লাভ তো কিছুই হলোনা বরং এখন হাত পা, সারা গায়ের চামড়াগুলো রুক্ষ শুস্ক হয়ে ফেটে কষ বেরোতে শুরু করেছে। নখগুলো ফেটেফেটে খয়েরি রং ধরেছে। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি কোন লাভ হয়নি। মেয়েকে কোলে নিতেও ভয় হয় এখন। আগামী মাসে ভেলরে যাব। ভাবছি ততদিন গেস্টরুমটাতেই থেকে যাবো। এই ঘরটাতে বেশ আলো হওয়া আসে। আর সবচেয়ে বড় কথা, চাইনা মৌসুমিও কাছে আসুক।

ভেলরেও ডাক্তারদের কাছ থেকে কোন আশার আলো পেলাম না। দুইমাস পরে ফলো-আপ করাতে যেতে হবে। তবে সেদিক থেকেও যে কোন আশা নেই তা আমি জেনেগেছি এতোদিনে। ভেলোর থেকে ফেরার পর যেদিন মেয়েটা আমায় দেখলে ভয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। মৌসুমী যেন পাথর হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন আর ব্যবসাও তেমন দেখে উঠতে পারিনা। আমার পক্ষে নড়াচড়া করাও অনেক কষ্টের এখন। পুরো শরীরে গাড় বাদামী রঙের ছোপে ভর্তি… শিরা ধমনীগুলো ফুলে ফুলে জালের মতো ছড়িয়ে পরেছে… টুকরো টুকরো ফাটা চামড়া গুলো আরো পুরু হয়ে চলেছে দিন কে দিন… মুখটা অসম্ভব ঝুলে পড়েছে।

ফলো-আপের জন্য ভেলরে যাইনি আর। এখন আমি আর ঘর থেকেই বের হই না। খাওয়া দাওয়া বলতে লিকুইড ডায়েটেই আছি। হাঁ করতে বা চিবোতেও পারিনা আর অনেকদিন হলো। মনের দিক থেকে প্রস্তুত হয়েগেছি। এখন আর কোন দ্বিধা নেই। মাথার ওপর ছাদ আছে, আমাদের ব্যবসা ওয়েল এস্টাব্লিশড। বাকিটা মৌসুমী এতদিনের পটু হাতে ঠিক চালিয়ে নিতে পারবে। কষ্ট শুধু মেয়েটার বড়ো হওয়া দেখে যেতে পারব না, মৌসুমীর সাথে বাকি জীবনটা কাটানো আর হবে না। তবে এ কুৎসিত, বীভৎস জীবন রাখার চেয়ে এইটুকু না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল।

খুব ইচ্ছা ছিল, যাওয়ার আগে একবার ওদের চোখের দেখা দেখে যাই। কিন্তু মনকে বাগে এনেছিলাম। আজকাল চলতে ফিরতে এতো কষ্ট হয়, পাদুটো ঘষে চলার জন্য এতো আওয়াজ হয়…

মাঝরাতে বেরিয়ে এলাম আমার ঘর, আমার সংসার, আমার প্রিয়জনদের ছেড়ে। অনেক কষ্টে নিজেকে হি‍ঁচড়ে টেনে টেনে নিয়ে চলেছি রেলস্টেশনের দিকে। ভোর রাতের মেল ট্রেনটাই এখন আমার শেষ শান্তির ঠিকানা। কিন্তু আর চলতে পারছি না। খুব হাঁফিয়ে উঠেছি। একটু দাঁড়াই। এখনো কিছুটা সময় আছে হাতে।

ভোরের আলো চোখে পড়তেই হাজারটা চিন্তা নাড়িয়ে দিয়ে গেল। মেল ট্রেনটা মিস করে ফেললাম। এখন কি হবে? বাড়ি ফিরব নাকি পরের ট্রেনের অপেক্ষা? এখনি হয়তো লোক জড়ো হয়ে যাবে আমার এই কুৎসিত অদ্ভুত চেহারা দেখার জন্য। আর … আর … আমি এই জায়গায় এলাম কিকরে? এতো গাছপালার মাঝে একটা উঁচু……

এ…এ…এ…. কি হচ্ছে? আমি কোথায়? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? প্রাণপণ চিৎকার করার চেষ্টা করছি, হাত পা ছুড়ে চলেছি…

******************************************************************

কতটা মেনে নিতে পেরেছি নিজেকে জানিনা। তবে এছাড়া আর উপায়ই বা কী আমার। গাছ তো আর সুইসাইড করতে পারে না। হ্যাঁ, আমি তথাগত সেন এখন একটা গাছ। বোকারঘাট স্টেশনের কিছুটা দূরে পরিত্যক্ত একটা জঙ্গলের মধ্যে একটা নতুন গাছ। জানিনা কতদিন এইভাবেই বাঁচতে হবে আমাকে। সাধারণত, এদিকটায় তেমন লোকের যাতায়াত নেই। শুধু মাঝেমাঝে সেই বুড়োটা আসে, কটা শিকড় উপড়ে নিয়ে চলে যায়।

(ক্রস পোস্টেড ফ্রম ভূত ভুতুম গ্রুপ, ইভেন্ট_গুছিয়ে_গেছো)

Anindita Dutta Sinha

আমি ভালবাসাকে ভালবাসি... আমি জীবনকে ভালবাসি। পেশায়, ফ্রিলাইন্সার গ্রাফিক ডিসাইনার। আমার আমিটার জন্য যেটুকু সময় পাই, চেষ্টা করি টুকরো কিছু ভাবনা আর ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকে সাজিয়ে এক-একটা ছবি আঁকাতে। উইশস্ক্রিপ্ট-এর সাথে যুক্ত হওয়ার আহ্বান পেয়ে খুবই ভাললাগছে। অনেক শুভেচ্ছার সাথে , অনিন্দিতা

More Posts

Related posts

Leave a Comment