হারিয়ে পাওয়া

লাল পাহাড়ের চূড়ার রোদ্দুর মাখা মেঘের দিকে অপলকে তাকিয়ে ছিল ধিতাং।কাল মহালয়া।বাড়িতে থাকলে এই সময় কত হইহই ।মা, কাকীমার সাথে হাজার দোকান ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা, ফেরার পথে ফুচকা খাওয়া-মজাই আলাদা।টিকলি তো দিদিভাই ছাড়া কিছু জানতো না, কে জানে এখন টিকলি দিদিভাইকে আর আগের মতো ভালোবাসে কিনা ।উঁহু, বাসবে না ।কেউই তো আর ধিতাংকে ভালোবাসে না ।সবার চোখে ধিতাং খুনি হয়ে গেছে ।জলে ভরে আসে ধিতাং-এর চোখে ।
ফেসবুক খুলে বসে ধিতাং ।এই ফেসবুকের বন্ধুরাই তো তার জীবনের একমাত্র জানলা, যা দিয়ে তবু কিছু আলো আসে ।পুরোনো ছবিগুলো দেখে মাঝে মাঝে ।এই তো কিছুদিন আগেও ঢিসুমের দিন দিন বেড়ে ওঠার ছবি তুলে পোস্ট করত ধিতাং ।কি করে কি হয়ে গেল ।
সেদিন তো ধিতাং ঢিসুমকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল পুজোর ঠাকুর দেখতে ।টিকলি আর ঢিসুমকে নিয়েই পাড়ার প্যান্ডেলে গেছিল সে।সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া ধিতাং কিছুদিন ধরেই পিকলু-দার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিল, তার ওপর পিকলু-দা মহালয়ার দিন প্রোপোজ করার পর থেকে সেই ভালোলাগা ভালোবাসা হয়ে যায় ।কথা ছিল, সপ্তমীর সকালে প্যান্ডেলে পিকলু-দাকে উত্তর দেবে ধিতাং ।সেই জন্যই ঢিসুমকে টিকলির পাশে বসিয়ে একটুখানি উঠে গেছিল ধিতাং ।টিকলিকে বারবার করে বলে গেছিল, ঢিসুমকে ধরে রাখতে – বড্ড পা হয়েছে ভাইয়ার ।পিকলু-দাকে উত্তরটাও দেওয়া হয় নি, লোকজনের চিৎকারে ছুটে এসে দেখে একটা গাড়ির তলা থেকে ঢিসুমের পা দুটো শুধু মাত্র দেখা যাচ্ছে – চারিদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে । তারপরটা পুরো অন্ধকার ধিতাং-এর কাছে ।জ্ঞান ফিরে নিজেকে দেখে মায়ের ঘরে ।ছুটে যায়, ঢিসুমের খোঁজ নিতে ।বাইরের ঘরে তখন লোকে লোকারণ্য ।চারিদিকে কান্নাকাটি ।ঠাকুমা ধিতাংকে যা নয় তাই বলতে থাকে – ঢিসুম নাকি ধিতাং-এর জন্যই মরে গেছে, ধিতাং নাকি ঢিসুমকে ভালোই বাসে নি নিজের মায়ের পেটের ভাই বলে ।
মা জোর করে ধিতাংকে ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে । ঢিসুমকে শেষ বারের মতো দেখতেও দেয় নি কেউ তাকে ।তারপর পরই কাকীমা আর টিকলি মামার বাড়ি চলে যায় ।
ঠাকুমা প্রতি মুহূর্তে ধিতাংকেই দায়ী করে যায় ঢিসুমের মৃত্যুর জন্য ।
বাবা কখনও কোন প্রতিবাদ করে নি, মা আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদত।
এরপরের দিনগুলো ধিতাং-এর কেটেছে অভিশাপের মতো ।ফেসবুকে বহুবার কথা বলতে চেয়েছে পিকলুদা।ধিতাং আর সহজ হতে পারে নি।পিকলু-দাকে কিছু বলতে গেলেই চোখে ভাসে সেই রক্তে ভেজা ঢিসুমের পা দুটো ।ধিতাং পারে না নিজেকে ক্ষমা করতে ।
তারপর বাবা একদিন উড়িষ্যার এই নার্সিং কলেজে ভর্তি করে দিয়ে গেলেন ধিতাংকে । প্রথম প্রথম খুব মন কেমন করত।মায়ের জন্য, কাকীমার জন্য, টিকলির জন্য ।পরে অভ্যাস হয়ে গেছে ।মা ফোন করে মাঝেমাঝে ।ভালোই আছে ধিতাং।অন্তত কেউ বারবার তাকে ঢিসুমের খুনি তো বলে না।আজকাল ও. টি অ্যাটেন্ড করে ধিতাং ।ডেলিভারিও অ্যাসিস্ট করতে শিখেছে ।কি যে ভালো লাগে – অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে ।আফসোস হয় – ইস, যদি ঢিসুমকে বাঁচাতে পারত।
পরদিন সকালে প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠালেন ধিতাংকে ।বাবা ষষ্ঠীর দিন ধিতাংকে নিতে আসবেন ।অদ্ভুত ।রুমে ফিরেই মাকে ফোন করে ধিতাং ।মা এড়িয়ে যায়।কিছুই বুঝতে পারে না ধিতাং । যখন বাড়ি পৌঁছাল ধিতাং তখনও ভোরের আলো ফোটে নি।বাবাকে সারা রাস্তায় কিচ্ছু জিজ্ঞেস করে নি-অভিমানে।
বাড়ি ঢুকতেই টিকলি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল দিদিভাইকে, সারা বাড়ির লোকজন ডাইনিং এ।দেড় বছর পরে ধিতাং বাড়ি এল।
কাকীমার দিকে চোখ পড়তেই চমকে ওঠে ধিতাং ।ছোট্ট একটা ভাই কাকীমার কোলে।
কাকীমা এগিয়ে এসে পুচকুকে ধিতাং-এর কোলে দিয়ে বলে, “সরি ধিতাং, কত কিছু শুনতে হয়েছে তোকে ।কখনও তোর কথা কেউ শোনে নি ।টিকলিও কিছু বলে নি ভয়ে ।পিকলু সব জানায় আমাকে, তারপর টিকলির কাছেও জানতে পারি সবটা।নে বাবু, আজ সেই সপ্তমীতেই তোকে তোর ভাই ফিরিয়ে দিলাম আমি ।এবার ক্ষমা করে দে আমাদের সবাইকে ।”
ধিতাং-এর চোখে অঝোর কান্না, মুখে হাসি ।কারো চোখই শুকনো নেই ।বাইরে অন্ধকার কেটে আলোর বন্যা, আর সেই আলোর বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধিতাংকে – জীবনের হারিয়ে যাওয়া স্রোতে ।
Sankhasathi Pal

Sankhasathi Pal

মফস্বল শহরের মেয়ে।পড়াশোনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে ।বর্তমানে মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের শিক্ষাদান জন্য প্রশিক্ষণরত।ভালো লাগে গান, সাহিত্য চর্চা এবং ফটোগ্রাফি ।

More Posts

Related posts

Leave a Comment