২০০ টা টাকা

(ছবিগুলো বেশ পুরোনো এবং খারাপ , মার্জনা করবেন )
বেশ কয়েকমাস আগে থেকে ট্রেনের টিকেট কাউন্টারে লাইন দিয়ে টিকিট কেটে কয়েকটা কনফার্ম আর দুএকটা RAC টিকিট পাওয়া যেত। বাবা ফিরেই বলতো এবার দার্জিলিং যাবো , টিকিট হয়েছে কিন্তু দুটো RAC আছে। পুজোর গন্ধ নাকে আসার আগেই টিকিট বাড়িতে আসতো। দুটো বড়ো ব্যাগ এর সঙ্গে কয়েকটা ছোটোখাটো ব্যাগ আর কয়েকটা জলের বোতল নিয়ে হাওড়া স্টেশনের বড়ো ঘড়ির তলায় বা শিয়ালদাহ স্টেশনের গেট পার করে অন্য কাকুদের অপেক্ষায় দাঁড়াতে হতো। কেউ না কেউ দেরি করে আসবেন, তার টেনশনটা বাড়তি পাওনা। ট্রেনে ওঠার সময় বিভিন্ন কায়দায় ব্যাগ গুলোকে কোনো রকমে বসার জায়গায় রেখে দিলে তবে শান্তি , আর কেউ বসে পড়তে পারবেনা। মন কিন্তু পড়ে থাকতো কখন মা রুটি আর কষা মাংসর কৌটো খুলবে। অন্যেরা চেয়ে থাকলেও গোগ্রাসে ডিনার করা একটা অন্যরকম ব্যাপার ছিল। NON AC স্লিপার ট্রেনে অদ্ভুত একটা ধাতব গন্ধ আর তার সঙ্গে যদি অ্যাটাচ – বাথ সিট্ হয় তাহলে কি হয় সেটা সহজেই বোঝা যায়।অনেক কষ্টে পূজাবার্ষিকীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় গপ্পোগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হতো। নীল রঙের প্লাস্টিকে মোড়া আপার বার্থে চাদর বিছিয়ে মাথায় এয়ার পিলো গুঁজে আরাম করে গপ্পো পড়ার মজাই আলাদা। সমস্যা ছিল , মাঝে মাঝে মাথার বালিশের হওয়া বেরিয়ে গেলে আবার ফুঁ দাও। সকালে কেক আর সঙ্গে ট্রেনের জঘন্য চা। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনটা চিরকালই একরকম আনন্দের অনুভূতি দেয়।
“আঃ ছাড় ছাড় অতবড় ব্যাগটা নিয়ে পারবিনা ,তুই জলের বোতলগুলো নে। মায়ের হাত ছাড়বিনা , দেখছিসতো কত লোক। ২০০ টাকাটা ঠিক করে পকেটে রেখছিসতো। ” এ হেনো সিকিউরিটি ওয়ার্নিং প্রতিবারই শুনতে হতো। এই যে ২০০ টাকা , এটার মূল্য তখন আমার কাছে অনেক। কি করে টাকাটা ঠিক ভাবে খরচ করা যাবে অাজও ঠিক করে উঠতে পারিনি। যা কিছুই করতে যাই মনেহয় ইস টাকাটা ফুরিয়ে যাবে তো। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের বাইরে গাড়িওয়ালারা তখনো পিরানহা মাছের দলের মতো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। চিৎকার চেঁচামেচি রাগ অভিমানের পালা শেষ হবার পর একটা গাড়ি ঠিক করা হত। “আরেকটু দর করলে সস্তা হতো একটু ” প্রতিবারের মতো বাবা ফিস ফিস করে মাকে এ কথাটা বলবেই। জানলার ধারের সিট্ টা আমার। মনে মনে এই সিটটার নাম দিয়েছিলাম সিরিয়াল বমি পোর্ট। ড্রাইভার কাকু ঠিক কত স্পীডে গাড়িটা চালাচ্ছে , কোন পায়ে ব্রেক ,একসিলেটর সেগুলো কখন টিপতে হবে এ ব্যাপার গুলো প্রতিবার ঝালিয়ে নিতে নিতে সেবক পর্যন্ত ঠিক পৌঁছে যেতাম। গাড়ি চালানোর কায়দা ছেড়ে দূরের কুয়াশা ঢাকা ঝাপসা পাহাড়। অদ্ভুত ভাবে গাড়ির নেপালি গানের শুরু এই পাহাড়ের সঙ্গে মিলে যেত। ” হাত বার করবেনা জানলা দিয়ে , বাইরে বাঁদরগুলো দেখেছতো , কামড়ে দেবে ” আজও আমি অবাক। চলন্ত গাড়ির জানলার বাইরে আমার হাতে কামড় দেবার জন্য বাঁদরগুলো এতো পরিশ্রম করবে ? কার্শিয়াং জায়গাটাও বেশ ভালো , হালকা ঠান্ডা , পাহাড়ের ঢালে চা বাগান। বাবা বলে এখানে থাকার ভালো হোটেল হলো করচেন প্যালেস , অনেক ভাড়া, বড়লোকেরা বা সাহেবরা থাকে। এই হোটেলটা শহরের বাইরে এসে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে গেলে একটুখানি। হোটেলের উল্টো দিকে খোলা আকাশের নিচে চা বাগান। বাবা ক্যামেরা জিনিসটা বোঝেননি তাই আমাদের কোনো ক্যামেরা ছিল না। ছবি তোলার ইচ্ছাটা খুব ছিল মনে মনে।
যখন তখন বৃষ্টি আর কুয়াশা ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। রাস্তার কোন বাঁকে পাশের শুরু রেললাইন বাঁ দিকে বা ডান দিকে পড়বে সেটা আজও মুখস্ত হলোনা। কুয়াশার ভেজা হাওয়া গায়ে লাগলে সর্দি জ্বর হবে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও জানলার কাঁচ তুলে দিতে হতো। ঘুম জায়গাটা বেশ অদ্ভুত , সত্যি জায়গাটা যেন মেঘের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে।এখানে একমাত্র বড়ো হোটেল Sterling Holidays Resort এ একবার খাওয়া দাওয়া করার সুযোগ হয়েছিল। জায়গাটা থাকার জন্য দারুন , আমার মনে হয় দার্জিলিঙের থেকে অনেক ভালো কিন্তু অনেক খরচ।বাবার কাছে বায়না করার সাহস হয়নি।বাতাসিয়া লুপে সাহেবরা টয়ট্রেনকে এক চক্কর গোল করে ঘুরিয়ে বেশি উচ্চতায় তুলেছিলেন। এই ট্রেনের চক্করবাজি দেখার জন্য একটু অপেক্ষা করতে হয়। দার্জিলিঙে গাড়ি কাকু বিদায় নেবার পর রাস্তার ধরে মা ও কাকিমাদের সঙ্গে আমাকে ঘন্টা খানেক দাঁড়াতে হতো। বাবা আর কাকুরা দল বেঁধে হোটেল অনুসন্ধানে বেরোতেন। উদ্দেশ্য শস্তায় ভালো থাকার জায়গা। ব্যাগ ছেড়ে কোথাও যাওয়া যাবেনা। পাহাড়ি ছেলে গুলো চারটে চাকা লাগানো কাঠের পাটায় চড়ে ওই টয় ট্রেনের লাইনের ওপর দ্রুত গতিতে গাড়ি চালালেও সেদিকে মন দেওয়া চলে না। জটায়ুর প্রখর রুদ্রের মতো ব্যাগের দিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হতো , কারণ এই দলে ছেলে বলতে তো আমি একাই।
দার্জিলিং জায়গাটা গাদাগুচ্ছের হোটেলে বেশ ঘিঞ্জি , ম্যাল জায়গাটা একটু বেশ ফাঁকা কিন্তু এক গাদা ঘোড়ার পটি। বাবা বলে দার্জিলিঙে সাহেবরা গরমকালে ছুটি কাটাতে আসতেন , তাই ওনারা ট্রেন লাইন বসিয়ে ছিলেন। সাহেবরা নাকি দার্জিলিং কে পাহাড়ের রানী বলতেন। এই দার্জিলিঙে কুয়াশার আক্রমণের কারণে সব সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার ঝলমলে রূপটা দেখা না গেলেও, মাঝে মাঝে দেখা যায়।হোটেলে ঘুমিয়ে বিকালে ম্যালে ঘোরাঘুরির সময় একটা কথাই বার বার ঘুরেফিরে আসে , “কাল ভোর বেলা উঠতে পারবি তো ? , টাইগার হিল যাবো , অনেক ঠান্ডা আর এখানকার থেকেও উঁচু।” অন্ধকার ভোরে চোখ কচলাতে কচলাতে বেশ লাল চোখে একগাদা সোয়েটার জ্যাকেট এবং সবথেকে অপছন্দের জিনিস হনুমান টুপি পরে জীপ গাড়ি চড়ে টাইগার হিলের উদ্দশ্যে রওনা দেওয়া। ভগবান নাক জিনিসটাকে ঠিক করে বানাতে পারেননি , একটু বেশি ঠান্ডা হলেই নাক অসাড় অথবা নাকের চামড়া ফাটা বেশ বিরক্তিকর। হু হু করে ঠান্ডা হওয়ার আক্রমণ উপেক্ষা করে এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে থেকেও ওই কুয়াশার জন্য কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড়ের মাথায় আলোর ছটা দেখা গেলো না। কিন্তু তাও বেশ ভালো লাগে ভোরবেলার এডভেঞ্চার। সারাদিনে তো কত জায়গা যাবার আছে। চিড়িয়াখানা , চা বাগান , রোপওয়ে , টয় ট্রেন চাপা – আরো কত কি।
পরদিন সকালে খাওয়া দাওয়ার পর টার্গেট মিরিক, ওখানে নাকি ইয়াব্বড় একটা লেক আছে। এর থেকেও বেশি উত্তেজক ব্যাপার হলো পশুপতি মার্কেট। এই বাজারটা রাস্তায় পড়ে এবং এটি নেপালে। বিদেশী জিনিস অত্যন্ত কম দামে পাওয়া যায়। গাড়িতে উঠেই আমার চিন্তা শুরু হলো ওই মার্কেটে ২০০ টাকা খরচ করা কি ঠিক হবে ?মিরিক জায়গাটা বেশ ছিল , বড়ো একটা লেকের ধারে ধারে অনেক হোটেল। লেকের ধারে একটা মাঠের মতো জায়গায় অনেক দোকান। সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো , প্যাডেল করে নৌকো চালানো।৩০ টাকায় এক ঘন্টা নৌকো চাপা যেত। মিরিক থেকে শিলিগুড়ি ফেরার রাস্তাটা দারুন লেগেছিলো , দুদিকে সবুজ চা বাগানের ঢিপির মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে রাস্তা। শিলিগুড়িতে গাড়ি ঢোকার বেশ কিছুটা আগে থেকেই গরম জামা খুলেফেলার কম্পিটিশন। শিলিগুড়িতে একটা বাজার ছিল বা আছে – হংকং মার্কেট। কোথায় শিলিগুড়ি আর কোথায় হংকং। এই বাজারে গিয়েও মনে শান্তি নেই, এতো রকমের আকর্ষণীয় খেলনা। কিন্তু ২০০ টা টাকা কি এরকম করে নষ্ট করা ঠিক হবে ? যদি পরে আরো ভালো কিছু কেনার ইচ্ছা হয়।
আলাদিনের জীন

আলাদিনের জীন

আলাদিনের প্রদীপের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা জীনটার মতোই কুঁড়ে এবং বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে বা দিবা স্বপ্ন দেখে কাটাই। অভ্যাস বসত আমাকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার কারণে মাঝে মধ্যেই ঘর ছাড়া হতে হয়। আমি ঝোলা কাঁধে নিয়ে একাই অনেক জায়গা ঘুরে বেড়াই। আমি সাহিত্য জানিনা তাই যা চোখে দেখি আর যে সব উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসে সেগুলোই টুকলি মারি।

More Posts

Related posts

Leave a Comment