জানা অজানার পথে / জোঁকের সাথে

13439199_215903168804749_4200870446138056723_n-1

হঠাৎ ইচ্ছা হলো চেনা জায়গা কে অচেনা করে দেখি। তাই বেরিয়ে পড়লাম ঝোলা কাঁধে নিয়ে, শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে রাত্রে ট্রেন এ New Jalpaiguri স্টেশন এর উদ্দেশে , ভাড়া ৩৫০/- (নন এসি) । সকাল বেলা চা খেয়ে দাঁত মেজে নেমে পড়লাম NJP তে। একগাদা গাড়ির দালাল ছেঁকে ধরল নানা জায়গা নাম আর দাম শুনতে শুনতে পৌঁছলাম অটো স্ট্যান্ড এ। share অটো তে উঠে রওনা দিলাম শিলিগুড়ি junction এর দিকে , ভাড়া নিল ২০ টাকা।চেনা রাস্তা চেনা পরিস্থিতি, সহজে দার্জিলিং যাবার share গাড়ি (১৩০ টাকা মাথা পিছু ) পেয়েগেলাম। অনেকদিন পাহাড়ে আসি নি , মন টা গাড়িতে উঠে তাই চঞ্চল হয়ে উঠলো, কানে John Denver এর Country Roads গুঁজে চললাম পাঙ্খা বাড়ি র রাস্তা দিয়ে। বৃষ্টি ভেজা রাস্তা দিয়ে চেনা Kurseong পেরিয়ে Sonada তে চায়ে break . গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ে চলেছে। ঠাণ্ডা হওয়া আর ভেজা চক়্চকে কালো রাস্তা টা পাহাড়ের বুক চিরে চলেছে দার্জিলিং এর দিকে , আনমনে কি যেন ভাবছিলাম , হটাত দেখি ঘুম এ এসেগেছি। ড্রাইভার দাদা কে বললাম দাঁড়াও দাঁড়াও এখানে নামবো। ঘুম স্টেশন এর বাঁ দিক দিয়ে একটা রাস্তা সুখিয়া র দিকে চলে গেছে , ওই রাস্তার মুখে বেশ কিছুক্ষন দাঁড়ানোর পর একটা গাড়ি পেলাম যেটা সুখিয়া যাচ্ছে। কিন্তু বসার কোনো জায়গা নেই , ড্রাইভার দাদা কে রিকোয়েস্ট করে চড়ে গেলাম গাড়ির ছাদে , ভাবলাম মাত্র তো ১০ KM রাস্তা কি আর হবে। বৃষ্টি টা থেমে ছিল তাই জ্যাকেট টা বের করা হয় নি। গাড়ি চলতে শুরু করার পর ই বুঝলাম এ ঠাণ্ডা হওয়া আমার জন্য নয় , ভাগ্যিস জ্যাকেট আর টুপি হাতের কাছে ছিল। সুখিয়া তে নেবে ২০ টাকা গাড়ির ভাড়া মিটিয়ে, চেনা এক দোকানে ঢুকলাম মোমো খেতে , দোকানের মালকিন এর সঙ্গে একটু আড্ডা মারলাম আর জানতে চাইলাম মানেভঞ্জন যাবার গাড়ি পাবো কিনা। ৬০ টাকার চিকেন মোমো খাবার পর ফল এর দোকান থেকে ১ ডজন কলা আর বেশ কিছু অন্য ফল কিনে উঠেপড়লাম মানেভঞ্জন যাবার মারুতি ভ্যান এ , ৫ সিটের গাড়ি তাতে ড্রাইভার দাদা সমেত ৮ জন মানুষ , মনে মনে ভাবলাম কলকাতা হলে গাড়ির সামনে ৪ জন দেখলেই পুলিশ কাকু দের দারুণ ইনকাম হত। ২০ মিনিট পর মানেভঞ্জন নাবলাম ৩০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে , কয়েকটা দোকানে ঘোরাঘুরি করে জুতো চটি জ্যাকেট এই সব দেখে একটা লিকর শপ থেকে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে হাঁটা শুরু করলাম চিত্রের দিকে। চিত্রে জায়গা টা মাত্র দু কিলোমিটার কিন্তু খুব চড়াই রাস্তা তাই এক ঘণ্টা বা তার একটু বেশী সময় লাগে হেঁটে গেলে। এই দু কিলোমিটার যেতে গিয়ে আমার দুটো কলা , একটা পেয়ারা এক লিটার জল ফুরোলো , যাই হক হাঁপাতে হাঁপাতে দুপুর তিনটে নাগাদ পৌঁছলাম চিত্রে তে ফেনজু র বাড়ি। একটা থাকার ঘর বলাই ছিল , ব্যাগ পত্তর রেখে দোলমা ভাবি কে বললাম কিছু খেতে দিতে। বেশ ভালো একটা ডিম দেওয়া চাউমিন খেয়ে ওই ঠান্ডায় চান করে নিলাম , কারণ এর পর কবে চান করবো কে জানে 🙂 . বিকালে কোথাও যাবার নেই তাই ওদের সঙ্গে আড্ডা মেরে কাটালাম , ফেনজু র বাবা ৮০ বছর এর ও বেশী বয়স মাঝে মাঝে তিব্বতী ভাষায় কিছু বলেন , এক বর্ণ ও বুঝতে পারি না এই সব করতে করতে আর ওদের দুটো বেড়াল এর সঙ্গে খেলতে খেলতে কখন জানি রাত আট টা বেজে গেলো। চিকেন , কিছু সবজি আর কিছু ফল খেয়ে ডিনার শেষ করে শুতে চলে গেলাম। ঘুম ভাঙল ভোর ৪.৪০ , চোখ খুলে অবাক়্ , জানালা দিয়ে দার্জিলিং পাহাড়ের মাথায় টকটকে লাল মেঘের মুকুট , সেলফোনে ছবি তোলার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে বুঝলাম, সময় নষ্ট না করে চোখ টা ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ

13606659_215902748804791_3201591519040396145_n-1

কিছু ফল আর ডিম সিদ্ধ খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এবার ঠিক করেছি চেনা রাস্তা দিয়ে না গিয়ে অচেনা রাস্তা বা যেখানে রাস্তা নেই সেখান দিয়ে যাবো। চিত্রের পেছন দিকে ঘাসের ভ্যালি দিয়ে যেতে যেতে বুঝলাম একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি , নুন মাখানো মোজা বা প্লাস্টিক এর গামবুট কোনোটাই আনা হয় নি। 🙁 জোঁকের থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় তো জানা নেই , কিন্তু প্রকৃতির এতটা কাছে এসে ফিরে যাবো ? কাটুক জোঁক, ক ফোটা রক্ত গেলে শরীর এর কিছু ক্ষতি হয় না। ফোনে ম্যাপ ক্যাচ করে রেখেছিলাম যাতে ইন্টারনেট না থাকলে GPS টা দেখতে পাই। মোটামুটি দিক ঠিক রেখে বনজঙ্গল বা কখনো ভেজা ঘাসের ভ্যালি দিয়ে চললাম মেঘমা র দিকে। ছবি তোলার চেষ্টা করতে গেলে দাঁড়াতে হবে আর দাঁড়ালেই ভয় জোঁকের। মাঝে মধ্যে পা ঠুকে ঠুকে চার পাঁচ টা করে জোঁক জুতো থেকে তাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে মনে হল জুতোর ভেতরে পা টা চট চট করছে। জুতো খুলে রক্তে লাল মোজা টা ফেলে দিলাম আর দোলমা ভাবীর দেওয়া নুন ছিটিয়ে জোঁক মারলাম। দু পা তে এক অবস্থা , যাই হোক পায়ে কিছু টা নুন মেখে নিলাম
(কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে কি জিনিস বেশ ভালোই বুঝলুম).
GPS দেখে বুঝলাম লামেধুরা আমার ডান দিকে এবং ওখানে একটা চা এর দোকান ছিল জানি , পাহাড় ভেঙে উঠে পড়লাম রাস্তার কাছাকাছি। কপাল আমার বেশ খারাপ , এখন ট্যুরিস্ট খুব কম কারণ সান্দাকফু যাবার রাস্তা বন্ধ তাই দোকান ও বন্ধ। ভেজা পা মুছে আবার নুন মেখে বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশে। …..

13606685_215902028804863_1902789865598555592_n-1

আলাদিনের জীন

আলাদিনের জীন

আলাদিনের প্রদীপের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা জীনটার মতোই কুঁড়ে এবং বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে বা দিবা স্বপ্ন দেখে কাটাই। অভ্যাস বসত আমাকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার কারণে মাঝে মধ্যেই ঘর ছাড়া হতে হয়। আমি ঝোলা কাঁধে নিয়ে একাই অনেক জায়গা ঘুরে বেড়াই। আমি সাহিত্য জানিনা তাই যা চোখে দেখি আর যে সব উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসে সেগুলোই টুকলি মারি।

More Posts

Related posts

One thought on “জানা অজানার পথে / জোঁকের সাথে

  1. Nandita Mitra

    Bhishon bhalo lekha.

Leave a Comment