“দ্যা আননোন ইমোশন”

ইউ কেন? ভারী মজা লাগল আমার, এমনকি, জায়েশ ভাই পর্যন্ত কৃষ্ণা কে ক্রুষ্ণা বলে ডাকছে…

আমি হাতছানি দিয়ে ডাকলাম কৃষ্ণা কে,

– ম্যাঁ তুঝে কৃষ্ণা বুলাউঁ তো চলেগা?

বেশ যেন কৌতূক পেয়ে গেল আমার কথায়। হেসে, দৌড় দিয়ে চলে গেল ওদের ভাঙ্গাচোড়া ছনের শেডটার পেছনে, আপাতত ওটাই আমাদের তাজ প্যালেস।

জায়েশ ভাই এর সাথে এই বার্ড সাঞ্চুয়ারীতে আমার চলে আসাটাও রীতিমতো কাকতালিও বলা চলে। জামনাগরে ট্রান্সফার হয়ে আসার পরেই বুঝছিলাম, এই শহরটার একটা কি জানো টানতো আমাকে, হতে পারে সেটা নতুন জায়গার মোহ বা সাইটের হাড়খাটুনি কাজের থেকে নিস্তার পেলে, ফের এই শহরের বুকে ফিরে আসার স্বস্তিটা। যেটাই হোক, আমি খুব এনজয় করছিলাম এই নতুন জায়গার ভোরের শীত শীত ভাব… দুপুর ১২ টার ছাতিফাটা রোদ্দুর, বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া… প্রতিটা রাত যেন, শরতের রাতের মতো হাল্কা হিমেল হয়ে থাকত। চেনা অচেনা গাছ গুলোতেও যেন ছিল, একটা রাজকীয় গাম্ভির্য। আর যেটা অস্বীকার করতে পারি না তা হল, এখনকার স্ট্রীট লাইফ। একটা যেন অলস অথচ প্রানচঞ্চলতা লেগে আছে। সময় পেলেই টুকটাক ক্যামেরা বন্দী করছি নতুন এই শহরকে।

এরই মধ্যে, এক রবিবারের সকালে, কয়েকটা ফটো প্রিন্ট আউট নিতে পৌঁছেগেছিলাম লোকাল একটা ফটোস্টুডিওতে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, নেক্সট রবিবার একটা ওয়ার্কশপ রয়েছে ফটোগ্রাফির ওপর, খুব এক্সাইটমেন্টে নিজেকে এনরোল্ড করিয়ে নিই। আর তার পরের রবিবারই স্কীল আর এক্সাইটমেন্টে ভরপুর ওয়ার্কশপের সাথে আমার উপরি পাওনা জয়েশ ভাই। জায়েশ মেটা। একজন ওয়াল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার। মহেসানায় থাকেন। পাশাপাশি বসার সুত্রে, আমায় ওয়ার্কশপের হাতেকলমে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন অনেক খুটিনাটি। দারুণ মানুষ এই জয়েশ ভাই… অল্প সময়ের আলাপেই আমাদের মধ্যে একটা বন্ডিং ক্লিক করে যায়। কথায় কথায় জানতে পারি তিনি জামনগরে স্টে করছেন আরো কিছুদিন, নেক্সট উইকএন্ডে তিনি যাবেন খিজিরিয়া বার্ড স্যাঞ্চুয়ারী। শুধু বলার অপেক্ষা ছিল… আমায় অফার করতেই রাজি হয়ে গেলাম সাথে সাথেই খিজিরিয়া অ্যাডভেঞ্চারের জন্য।

গতকাল প্রায় ভোররাতে, আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম, জায়েশ ভাই যেই হোটেলে উঠেছেন সেই হোটেল থেকে ঠিক করে দেওয়া গাড়ি আর তার ড্রাইভার হিতেন। বয়স আন্দাজে, বেশ স্কীল্ড ড্রাইভার। কিছুটা রাস্তা আসার পর, আমরা গাড়ী থেকে নেমে পায়ে হাঁটা শুরু করেছিলাম। সে এক দারুণ অণুভুতি। ক্যামেরা সেট করা, ন্যাচারেল লাইটের সাথে সেট করিয়ে তার সেটিংস, ভোরের প্রথম আলোয়, পিঙ্ক ফ্লেমিংগ, বা উদাসী একলা মাছরাঙা, অভিজাত পেলিকান্স আরো কতো নাম নাজানা পাখি আর তার মাঝে রোমাঞ্চিত আমি। জায়েস ভাইয়ের গাইডেন্স আর অনুপ্রেরণায় আমিও বেশ ভাল কয়েকটা শট পেয়ে গেলাম। সকালের আলো ভালো মতো ফুটে ওঠার পর একটা ব্রেক নিলাম আমরা, আর তখনই যেন টের পেলাম এতোক্ষনে বেশ ভাল মতোনই ঠান্ডাটা লেগে চলেছিল। জয়েশ ভাই বলল, চলো তোমায় নিয়ে যাই, দেখ এখানের চা খেলে কোনদিন ভুলতে পারবে না। নিজেদের জিনিসপত্র মোটামুটি গুছিয়ে নিয়ে, হাঁটা দিলাম আমরা। চলতে চলতে চারপাশ যতো দেখছি ততো যেন মোহগ্রস্ত হয়ে পরছিলাম, সমুদ্র তট আর তার থেকে খারির মতো ঢুকে এসেছে দূর থেকে একেবেঁকে নিজের ইচ্ছামতো সরু সরু আলের মতো রাস্তা ঢুকে এসেছে এঁকেবেঁকে। রাস্তা থেকে নিচে জমি প্রায় ৫-৬ ফিট নিচু কোথাও কোথাও। এখন বুঝলাম কেন রাতের অন্ধকারে গাড়ি নিয়ে আমরা এতোটা ভেতরে ঢুকে আসি নি। বেশ কিছুটা আসার পর একটা অপেক্ষাকৃত চওড়া জায়গায় পৌঁছালাম, এমন জায়গা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, এতে এক একেকটা ওয়াচ টাওয়ার হয়েছে। তবে এই টাওয়ারটাই মনে হয় সব থেকে কাছে। যেখানে আমাদের গাড়ি রাখা রয়েছে তার। জয়েশ ভাই আমাকে, শুকনো ডালপাতা আর কাঠের গুড়ি দিয়ে তৈরী একটা ছাউনি মতো দেখিয়ে বললেন, “ওয়ার্লড্‌স বেস্ট টি”। ছাউনিটার পেছন দিকে সাদা হয়ে আছে, কার্পাস তুলোর ক্ষেতে। এগিয়ে যেতে যেতেই ঘন দুধের চা এর গন্ধে বেশ একটা আমেজ চলে এলো মনে। ছাউনির বাইরে, আলোয়ান গায়ে দিয়ে একটা লোক বসে আছে জুবুথুবু হয়ে, এই শীতের সকালেও কেবল গায়েই জড়ান আলোয়ান এদিকে শীর্ণ পা দুটো হাটু থেকে খালি। অদ্ভুদ ভাবে একে দেখে আমি কিছুতেই ঠাহর করতে পারলাম না লোকটির বয়স, ৫০ না ৮০। কাঁচাপাকা কোকড়া চুল ঝুকে রয়েছে, কুচকে যাওয়া মুখটার ওপর। তার থেকেও বেশি ঝুকে রয়েছে রাশ রাশ বিরক্তি লোকটার মুখে। ছাউনির ভেতরের দিকে, আরেকটি মানুষ… এই সম্ভবত আমাদের জন্য চা বানাচ্ছে। কিন্তু একি পুরুষ না মহিলা বোঝার উপায় নেই, ছেঁড়াছেঁড়া অনেকগুলো কাথা জড়িয়ে যেন একটা উলের গোলার মতো, উবু হয়ে বসে আছে মাটির উনুনটার সামনে। হিতেন পাশ থেকে এসে বুড়ো লোকটিকে জিজ্ঞেস করল কিছু। তারপর বলল, “সাব, বস… ৫-১০ মিনিট ওয়েট কর লিজিয়ে, চাহে তো আপ ভি, বড়ে সাহাব কি তারাহ থোড়া ঝপকি লে লিজিয়ে…”। আমি বললাম, “নেহি নেহি, ম্যাঁ থোডা টহল লেতা হুঁ”। আমি আসলে, এতো কাছ থেকে, কার্পাসের ক্ষেত দেখি নি আগে, তাই পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম ক্ষেতের দিকে। নীল, সাদা আর সবুজের লেয়ার ভরে নিচ্ছি দুচোখ ভরে, হঠাৎ -ই ঝোপ থেকে বেড়িয়ে এলো এক মূর্তিমান। প্রথমটায় আমাকে থমকে দিলেও পরমূহর্তে আমাকে অবাক করে দিয়েছিল, বাচ্চচাটার অ্যাপিয়ারেন্স। ঠিক যেন, সত্যজিত রয়-এর অপু। একটা চওড়া হাসি,ময়লা মুখে উজ্জ্বল দুটো চোখ, একহাতে মূঠোমুঠো সাদা কার্পাস, অন্য হাতে হাওয়া ভরা প্লাস্টিকে, হলুদ প্রজাপতি।

সত্যি বলতে জয়েশ ভাই ঠিকই বলেছিলেন, এতো দারুণ চা আমি জীবনে খাই নি। কথায় কথায় জানতে পারলাম, ঐ ছাউনির পাশে উবু হয়ে বসে থাকা লোকটারই ছেলে ঐ বাচ্চাটি। নাম ওর ক্রুষ্ণা। আর এখানেই অবাক হলাম আমি। বুঝলাম এরা কৃষ্ণা কে ক্রুষ্ণা বলে উচ্চারণ করে।

আমি চা টা খেতে খেতে আমার ল্যাপটপে খালি করতে লাগলাম ক্যামেরাটা। ছবি গুলোর দেখার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। তবে শুধু আমি নই, আরেকজনও ঘুর ঘুর করে চলেছে, আমার আশেপাশে। ল্যপটপটা কৃষ্ণার দিকে ঘুরিয়ে ডাকলাম ওকে। তবে ও কিন্তু ফটোগুলো দেখতে একদম কোন উৎসাহ দেখাল না। একদৃষ্টে চেয়ে আছে, কিপ্যাডের দিকে। যেন কিছুটা অবিশ্বাস ওর অভিব্যাক্তিতে। আমি আরেকটু এগিয়ে দিলাম ল্যাপটপটা। কিছুক্ষন একদৃষ্টে চেয়ে দেখে, হঠাত করে “এ” কি টা প্রেস করে, দৌড় মেরে চলে গেল কৃষ্ণা। আমার বেশ মজা লাগল কিন্তু ব্যাপারটায়। মেমরি কার্ডটা খালি করে, আরো কিছুক্ষন রিল্যাক্স করলাম আমরা। বেশ কয়েকটা ফটোও নিলাম কার্পাস ক্ষেতের আর আমার নতুন বন্ধু কৃষ্ণার। তবে যা চঞ্চল, ফটো নিতে গিয়েও বেজায় মুশকিলে পড়তে হচ্ছিল আমায়। সেকেণ্ড রাউন্ড ফটো তোলার জন্য উঠে পরলাম আমরা। কৃষ্ণার দিকে চোখ পড়তেই দেখি, তার হাতে ধরা সেই প্লাস্টিক থেকে সে একে একে দুটো প্রজাপতিকেই ছেড়ে দিচ্ছে, তবে তার চেহারা বলছে, এতে তার নিজের সম্মতি নেই বিন্দুমাত্রও। আমি এগিয়ে গিয়ে জজ্ঞেস করলাম, “কেয়া হুয়া কৃষ্ণা?” …। কৃষ্ণা নিজের মাথা না ঘুড়িয়ে শুধু আঙুলের ইশারায় সেই উলের গোলার দিকে দেখিয়ে দিল, যে আমাদের চা করে খাইয়েছিল। বুঝলাম, তার কাছ থেকে বকা খেয়েই, অগত্যা এই কাজটা করতে হল কৃষ্ণা কে। দুটো ১০০ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলাম ওর দিকে। কিন্তু মান ভাঙাতে তো পারলামই না, কোন ইন্টারেস্টও দেখালো না কৃষ্ণা। জয়েশ জি এর তাড়ায় হাঁটা লাগালাম ফের ক্যামেরা কাঁধে।

এই দফায় ফটো তোলার থেকেও আমি টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো ভাল করে বুঝে নিচ্ছিলাম জয়েশ জি এর কাছ থেকে। একটু বেলা পরলে, আমরা যখন ফিরে আসালাম, গাড়ির জন্য, কৃষ্ণারা তাদের চা এর বন্দবস্ত তখন সব গুটিয়ে নিয়ে চলে গেছে। শুধু কৃষ্ণার বাবা তখনও সেই একি ভাবে বসে রয়েছে একি জায়গায়।

লাঞ্চটা জয়েশ জির সাথে হোটেলেই সেরে ফেললাম, আমার প্রথম বার্ড ফটোগ্রাফি। আমাকে আরো এনকারেজড করতে লাগলেন জয়েশ জি। আমি তখন টপ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড, যখন জায়েশ জি আমায় বললেন কিছু ফটো এতো ভাল এসেছে যে উনি সেগুলো কে কয়েকটা অ্যামেচার ফটোগ্রাফি কনটেস্টের জন্য পাঠাতে চান। ওনার কথামতো মেমরি কার্ডটা রেখে সেদিনের মতো বিদায় নিলাম আমি।

camera_eye_by_mrbee30-d2y19mx

মার্চ এন্ডিং… কাজের চাপে শ্বাস ফেলার সময় নেই। এমনি এক সময়ে ফোন এলো জয়েশ জি র।

– ইয়ে সানডে কেয়া কর রাহে হো?

– গুড মর্নিং জায়েশ জি। কাহা হো আপ আভি?

– পহলে বাতাও ইয়ে সানডে কো কেয়া কর রাহে হো?

– জি আবতক তো ফ্রি হি হুঁ।

– ভেরী গুড। ইউ হ্যাভ টু কাম টু আহমদাবাদ।

– আহমদাবাদ!! বাট হোয়াই? বাই দা ওয়ে, হাউ আর ইউ?

– ওহ! আই অ্যাম অ্যাবসোলিউটলি ফাইন মাই ডিয়ার, বাট আই হ্যাভ টু কনফেস সামথিং টু ইউ। বাট বিফর দ্যাট, টেল মি কুড ইউ প্লিস কাম টু আহমেদাবাদ? ইফ ইউ মেক ইউর মাইন্ড দেন লেট মি নো…

– আই অ্যাম অলওয়েস রেডি ওন ইউর কল, জায়েশ জি।

– দেন গ্র্যাব দা স্যাটারডে লেট নাইট’স ভল্ভো বাস… ইট উইল রিচ, আহমাদাবাদ বাই ৬ মর্নিং। আই উইল পিক ইউ আপ ফ্রম পাল্ডি বাস স্ট্যান্ড।

– ওকে আই উইল কনফার্ম ইউ দা বাস টাইমিং।

ফোনটা কেটে দিয়ে, আমি ভাবতে বসলাম, এতোক্ষন কি কি বলে গেলো জয়েশ জি। কনফেশন… আহমদাবাদ… আমার যে মেমরি কার্ডটা জয়েশ জি এর কাছে ভুলে গেছিলাম হয়তো সেটাই ফেরত দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু তার জন্য কনফেশন কথাটা বলছেন কেন? কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না, তবে এইটুকু জানি, যে একদিনের অ্যাটাচমেন্টে, জয়েশ জি এর একটা ডাকই কাফি আমার জন্য।

শনিবার, রাত ১০ টার বাসে উঠে পরলাম। জয়েশ জি বলে দিয়েছেন, উনি ৬ টা নাগাদই চলে আসবেন পালডিতে।

বাস ছাড়ার পর, ভাবলাম জমিয়ে একটা ঘুম দেব। কিন্তু রাতের অচেনা গুজারাট আমায় ঘুমাতে দিল না। ফাইন রাস্তা আর তার দুপাশে ধু ধু করা জমি, বাবলা গাছের ঝার ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এই মনোটোনাস অন্ধকারের মাঝে কখনো টিমটিমে আলোর গ্রাম আবার কখোন ঝকঝকে, নিঝুম শপিং মল আসা যাওয়া করছে। তবে আমাকে আসলে যা জাগিয়ে রাখল তা ছিল, পূর্নিমার চাঁদ। আমার সাথে সাথেই সেদিন চলছিল। ভোর ভোর একটু চোখ লেগে এসেছিল। বাসের হেল্পারটা এসে ডেকে গেল, “পালডি রেডি হো যাইয়ে”।

এক্সাইটমেন্টটা যেন, দ্বিগুন চাগার দিয়ে উঠল। জয়েশ জি মানেই তখন অ্যাডভেঞ্চার আমার কাছে, আর তার ওপর জয়েশ জি এর রহস্যময় কথা।

পালডি তে নেমেই, দেখি ঝকঝকে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে জয়েশ জি। আমার আশার থেকেও বেশি জোরেই জায়েশ জি আমায় জড়িয়ে ধরলেন, তারপর আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, “আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি ফর ইউ মাই চাইল্ড, র‍্যাদার টু সে, আই অ্যাম ভেরি প্রাউড ফর ইউ”। আমি বেশ, অবাক হয়ে গেলাম, বললাম, “ ম্যাঁয় জামনগর সে আহমাদাবাদ আ পায়া ইস লিয়ে আপ মুঝপর প্রাউড ফিল কর রাহে হ্যায়?”

অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন জায়েশ ভাই। বললেন, “যব তুমহে পাতা চলেগা, তো তুমভি  খুদ পর প্রাউড ফিল করোগে”

আমি বললাম, “আব তো সাসপেন্স তোরিয়ে”।

গাড়িতে বসার জন্য ইশারা করলেন জয়েশ জি। গাড়িটা স্টার্ট করে, তিনি বললেন,

– তুমহে ইয়াদ হ্যায় তুমহারা মেমরিকার্ড, যো মেরা পাস রহ গ্যায়াথা?

– হ্যাঁ।

– অ দেখতে হুয়ে ম্যাঁ রুক গ্যায়া এক ফটো পর, বহত কম ফটো মুঝে, ইতনা স্পেলবাউন্ড কর চুকা হ্যায় আজতক।

– কোনসা ফটো জয়েশ জি?

– চলো, হোটেল পহলে। পর ইয়ে হুয়া মেরে সারপ্রাইজড হোনে কি স্টোরি, আব বাকি হ্যায় মেরে গিল্ট কি কাহানি। তুমহে ইনফর্ম না করকেহি ম্যায় উস ফটোকো, ন্যাট জিও ইন্ডিয়া কি “স্ট্রীট ফটোগ্রাফি – থ্রু আন অ্যামাচার’স আই” কহকে এক ফটোগ্রাফি কম্পিটিশন মে ভেজ দিয়াথা। আফকোর্স তোমারেহি নামসে।

আমার এতক্ষণের এক্সাইটমেন্টটা এবার একদম নিভে গেল তারপর আবার দ্বিগুন উত্তেজনা নিয়ে ফিরে আসল। এবার সাথে নার্ভাসনেসও।

– দেন?

– আজ তুমহে ইহা বুলানে কি পারপাসই হ্যায়, ইয়ে।

জয়েশ জি এর ঠোঁটে পাতলা হাসিটি চওড়া হওয়ার সাথে সাথে আমার টেনশন বেড়ে যেতে লাগল।

– ইউ হ্যাভ ক্রাকড ইট মাই বয়। ইউ হ্যাভ গট দ্যা ফার্স্ট পোজিশন। অ্যান্ড ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া অ্যাবাউট দ্যা প্রাইজ মানি? হা হা হা… ইট’স ৫ ল্যাক মাই ডীয়ার, ইট’স ৫ ল্যাক…

কিছু মূহুর্তের জন্য আমি যেন ডাম্ব হয়ে গেছিলাম। ফটো কম্পিটিশন, ৫ ল্যাক, আর এমন একটা ফটো যা আমারই ক্লিক অথচ আমি নিজেই তাকে দেখিনি ভাল করে…

জয়েশ জি এর হোটেলে গিয়েই আমি দেখতে চাইলাম ফটোটাকে… জয়েশ জি, বললেন, “ ক্যায়সা হোগা? আগর তুম ও স্ন্যাপ সেরিমেনি মেহি দেখো তো?”

সেরিমেনি তে গিয়ে আমি টেনশন, খুশি, ইক্সাইটমেন্টে বিহ্বল হয়ে চললাম। আমি মনে মনে ঠিক করতে লাগলাম কি করব আমি এতোগুলো টাকা দিয়ে, আর ভাবতে লাগলাম কি বলব আমি আমার উইনিং স্পীচ-এ…

একটা ব্লার হয়ে যাওয়া, হাতে ধরা প্লাস্টিক, তার মাঝে দুটো হলুদ প্রজাপতি। আর … আর ফোকাস পরেছে, আরো কিছুটা দূরে যে মুখটায়… একটা শুকনো রুক্ষ ত্বকের এক্সপ্রেসন লেস মুখ… অথচ কি সপ্রতিভ দুটো জ্বলজ্বলে চোখ… যেন সব এক্সপ্রেসন গিয়ে আছরে পরেছে ঐ চোখ দুটো তে… সে চোখ দুটোর দিকে যেন চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকা যায় না, আবার, ফের না তাকিয়েও যেন উপায় নেই। … “দ্যা আননোন ইমোশন”

আমার নাম কল করার আগে, জয়েশ জি আমায় বলল, “ডোন্ট ডু অ্যানি ব্লান্ডার…”

আমি জয়েশ জি কে বলেই চলেছিলাম, “ হাউ কুড আই অ্যাকসেপ্ট দিস, আই হ্যাভ নো ক্লু অ্যাবাউট দিস ফটোগ্রাফ। মে বি আই হ্যাভ মিসটেকেনলি ক্লিকড্‌ ইট। আপ কো তো পাতাহি হ্যানা ম্যাঁ কৃষ্ণা কি ফটো লে রাহা থা, অউর ও ইধার উধার ভাগ রাহা থা, শায়েদ ইস মে হি মেরা শট আউট অফ ফোকাস চ্যালা গ্যায়া হোগা…”

জয়েশ জি, বললেন, “ফার্স্ট গো অ্যান্ড কালেক্ট দ্যা অ্যাওয়ার্ড, উই উইল টক অ্যাবাউট ইট ল্যাটার”

আমাকে জামনাগর ফেরার বাস এ তুলে দিতে এসে, জয়েশ জি, বলে গেলেন, “বিলিভ মি, আই হ্যাভ আ স্ট্রং ফিলিং দ্যাট উই দিসার্ভ ইট, উ হ্যাভ আ ইনোসেন্ট মাইন্ড, ডোন্ট থিংক মাচ, রাদার মেক দিস ফিলিং, অ্যান ইন্সপিরেশন… অ্যান্ড কিপ ক্লিকিং…”

বাসে আসতে আসতে আমি আমার ল্যাপটপে দেখছিলাম ছবিটা… এ নিশ্চই সেই মেয়েটি যে সেদিন আমাদের চা বানিয়ে খাইয়েছিল… খুব বেশি হলেও ১৮-১৯ বছরের মেয়ে…

আমি ঠিক করে নিলাম, আমায় কি করতে হবে… অন্তত হাফ অ্যায়ার্ড মানি, ঐ মেয়েটিও ডিসার্ভ করে…

রাত প্রায় সারে ৯ টা নাগাদ আমি পৌঁছালাম, জামনগর, সোজা চলে গেলাম, সেই হোটেলটায় যেখানে জয়েশ জি উঠেছিলেন। রিসেপশনে গিয়ে খোঁজ নিলাম হিতেন এর… হিতেন সেদিন থেকে নেক্সট ৫ দিনের জন্য ট্যুরে বেড়িয়েছে কোন ট্যুরিস্টদের নিয়ে। আমি নিজের ফোন নাম্বার দিয়ে, বলে আসলাম যেন আসলেই আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

খিজিরিয়া তে এসেছিলাম প্রায় ৪ মাস আগে, সেবার ছিল এক্সাইটমেন্টে ভরা, আর এবার যেন একটা দ্বায়িত্ব অনুভব করছিলাম, দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছি, চায়ের ছাউনিটা…

সামনে যেতেই দেখলাম, ছাউনিটাকে একটু যেন আলাদা লাগছে আগের থেকে। সেই মলিনতাটা যেন একটু হলেও কম। একটা মাঝ বয়সী লোক চা বানানোর ডেচকি চাপিয়ে দিল আমাদের দেখে…

হিতেন কে জিজ্ঞেস করলাম কৃষ্ণার কথা… হিতেনও আমার মতো এদিক ওদিক তাকিয়ে কৃষ্ণাকে খুঁজে নিল … তারপর এগিয়ে গিয়ে চায়ের দোকানের লোকটার সাথে কিছুক্ষন কথা বলে এলো হাত পা নেড়ে। ওদের ভাষা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে না পারলেও, হিতেনের মুখে চুকচুক শব্দটা শুনে, উঠে দাড়ালাম আমি। চায়ের গ্লাস হাতে ফিরে এসে হিতেন বলল, “কৃষ্ণা কে ঘর সে তো ইয়ে দুকান বেচ দিয়া ইসকো, ইয়ে বোল রাহা হ্যা কি উসকা এক বড়ি বহন হ্যায়, উসকা হি দিমাগ ফির গ্যায়া থা, যো সব বেচবাচ দিয়া”…

চা টা শেষ করে হিতেনকে জিজ্ঞেস করলাম এরা কি একি গ্রামের? গ্রামের নাম জানো?

চায়ের কাপ ফেরত দিয়ে এসে হিতেন বলল, দেড় খিজিরিয়া”

আমি বললাম, “চলো তবে, দেড় খিজিরিয়া”

প্রত্যন্ত একটা গ্রাম বলা চলে, দেড় খিজিরিয়া, শহর থেকে যেন একদমই বিচ্ছিন্ন। এদিক ওদিক কৃষ্ণার খোঁজ করতে করতে চলেছি আমরা, বেশি খুঁজতে হলনা, ৩-৪ জনই বলল, পাঠশালায় পাবো।

পাঠশালা বলতে, একটা বড় গাছের নিচে, চাদয়া টানানো একটা খোলা জায়গা, আর গাছে হেলান দেওয়া একটা চলটা ওঠা ব্ল্যাকবোর্ড। ৭-৮ জন ছেলে মেয়ে বসে আছে মাথা নিচু করে, আর টিপিক্যাল গুজরাটি পোষাক পরা, একজন গাছের নিচে বসে বই পড়ছে কোন।

আমরা এগিয়ে যেতেই উঠে দাড়ালো লোকটা, হিতেন এগিয়ে গিয়ে, তাদের ভাষায় কিছুক্ষণ কথা বলার পরই এগিয়ে এলো লোকটা।

– নমস্তে জি, ম্যাঁ ইহাকা মাস্টার জি। আপ ইহা আকার ব্যায়ঠিয়ে, ম্যাঁ কৃষ্ণা কো বুলা দেতা হুঁ।

অল্প দুরেই আরেকটা গাছের বেদি তে ছায়ায় বসলাম আমি। মাস্টারজি ফিরে যেতেযেতেই বুঝতে পারলাম, ঐ বাচ্চাদের মাঝে, কৃষ্ণাও আমায় দেখে নিয়েছে ততোক্ষণে। মাস্টারজি পৌঁছাতেই ছুটতে ছুটতে চলে এলো কৃষ্ণা। মনটা যেন ভারী হয়ে এলো। ওর জন্য আনা চকোলেট ওকে দিতে চাইলে, কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে একবার নিজের বন্ধু দের দিকে ফিরে তাকয়ে নিয়ে নিল চকোলেটটা আমার হাত থেকে। হিতেনের মাধ্যমে কৃষ্ণার সাথে কথা বললাম কিছুক্ষণ ঠিকিই, কিন্তু ওর বাবা বা দিদি কে যে এখন ঠিক কোথায় পাবো তা বুঝতে পারলাম না, ঠিক করলাম, মাষ্টারজির সাথেই কথা বলি। মাস্টার জি কে ডেকে দিতে বললাম কৃষ্ণাকে। দেখলাম মাষ্টার জি ততোক্ষণে, দুই গ্লাস ভরতি, ঠান্ডা ছাঁচ নিয়ে আসছেন আমাদের জন্য। কৃষ্ণা কে ফিরে যেতে বললাম, ওর পড়ার জায়গায়।

মাস্টার জি কে জিজ্ঞেস করলাম কৃষ্ণার পরিবারের কথা?

দেখলাম মাষ্টার জি কিছুটা মনমরা হয়ে গেলেন… তারপর বলতে শুরু করলেন…

“ক্ক্রুষ্ণাকে পিতা কভি ভি কামাতা নেহি থা কুছ ভি, উসকা কাম কারনে কা মন হি নেহি থা কভি ভি। কৃষ্ণা কি মা হি সব সাম্ভালতে থে, পাসহি মে ক্ষেত পে কাম করতি থি, একবার অ্যাইসি বিমার পরি কি ও চল বসি, ক্ররুষ্ণা, তব ১ সালকা রাহা হোগা অউর, উসকি বহন, ১৩-১৪ সাল কি। উস উমর মে তো সবকি শাদি হো জাতি হ্যায় ইহাপে। পর আপনি ভাই অউর ঘর কি জিম্মেবারি উঠা লি আপনি কান্ধো পর। আপনি মা কি থোরি বহত যো চান্দি কি জেবর থা উসে বেচ কে ও চায়ে কি দুকান লাগাই, সুরজ চরতে হি, ফির ক্ষেত পে কাম করনে লাগ জাতি থি, পর কাহনে মে বুড়া লাগতা হ্যা বাবু, উসকা পিতা, ইতনি ছোটেছোটে বাচ্চো কে খাতির ভি খুচ নেহি করতা হ্যা”।

মাস্টারের কথা মাঝ পথে থামিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ পর আজ যব গ্যায়ে ও চায়ে কি দুকান পে তো, ওহা কই অউর থে, উসনে বোলা…”

মাস্টার জি মাথা নাড়িয়ে বিষাদ নিয়ে হেসে বলল, “ও তো অউর এক কাহানি বাবু, ইয়ে জো গায়ো আপ দেখ রেখে হো, ইহা কুল মিলা কে ৫৩ ঘর হ্যা, ম্যায় আকেলা মাস্টার ইহা পে, আসল মে মেরা গায়ে হ্যা ৪। শহর কি দুকানো মে, উসকা হি দুধ বেচ কে মেরা গুজারা চল জাতা হে, কিসি তরহা। ইয়ে, মাস্টারি ম্যাঁ শখসে করতা হুঁ। কই কই ভেজতে হ্যা আপনে বাচ্চো কো, কই কই নেহি ভেজতে হ্যা। ৪ ক্লাস তক হি ইন্তেজাম হ্যা, ইহাপে। কৃষ্ণা, আভি ৪ ক্লাস মে হি হ্যা। আগলে বরস সে ইসকা, পড়াই বন্ধ হনে বালা থা। তো একদিন ইসকি বহন, আ কার মেরে হাত মে, ২০০ রুপাই থামাকার বোলা, মাস্টারজি, ন্যায়া পুস্তক লেকে আউ, ভাই কো সব পড়াও… ম্যাঁ পুছা ইতনে রুপায় কাহা সে মিলা? তো বলতি হ্যা কি দুকান বেচ দিয়া, আভি ক্ষেত পে হি য্যাদা কাম কর লুঙ্গি। আপ বাস মেরা ভাই কো বড়া আদমি বনা দো”।

এইটুকু বলে থামলেন মাস্টার, আমার চোখ ততক্ষণে কটকট করছে, দুপুরের গরম হাওয়ায় নাকি, চোখের গরম বাষ্পে তা বুঝছি না, কৃষ্ণা এই গরম হাওয়ার মধ্যেই বসে তার বন্ধুদের সাথে আমার দেওয়া চকোলেট ভাগ করে খাচ্ছে মহা আনন্দে। এই গরমে ক্ষেতে কাজ করছে, ওর দিদি আর তাদের মতো আরো কতো জনে… মাস্টার জি কে জিজ্ঞেস করলাম, “ ইহা পে কোই পোষ্ট ওফিস হ্যায়ে, মাস্টার জি বললেন, “আপ তো ও পিছে ছোড় কে আয়ে হো, দুসরি গায়ো মে হ্যায়”

আমি একটু ভেবেই মাস্টার কে বললাম, “ আপকো এক হেল্প করনা হোগা মুঝে, ম্যা ইহা কি স্কুল কে লিয়ে কুছ করনা চাহতা হুঁ”

আমার মুখের দিকে একটা অবাক দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইল, মাস্টার জি আর হিতেন।

কৃষ্ণার দিদি র সাথে যেদিন প্রথম মুখোমুখি হলাম, ও আমার পা ধরে কেঁদেই চলেছে। আমি ওকে উঠিয়ে, মাস্টার জি কে বললাম, “ উসে বলিয়ে, কি ম্যাঁনে কুছ নেহি কিয়া, সব উসকা মন কি শক্তি অউর উপরওয়ালা কি ইচ্ছা হে, যো মেরে হাথো সে হো রাহা হ্যা, অউর ইস কে বদলে মে মুঝে বস ইয়েহি চাহিয়ে কি, ইয়ে খুদ ভি পড়হাই শুরু কর দে”… আর হ্যাঁ কৃষ্ণার দিদির নাম জানলাম “আশা”। পোস্ট অফিসে, ৩ লাখ টাকা “এম আই এস” স্কীমে ভরে দিলাম আশার নাম করে স্কুলের জন্য, আর বাকি ২ লাখ রাখলাম কৃষ্ণা আর ওর দিদির নামে,…

ফুড়ফুড়ে হাওয়ার চুল উড়ছে আমার, হিতেনের পাসের সিট বসে ফিরিছি জামনগরে। জয়েশ ভাইকে একটু আগে মেইল করে দিলাম, কৃষ্ণা আর আশার নতুন স্কুলের ছবি গুলো। সাথে সাথে রিপ্লাই ও পেলাম নেক্সট সান ডে, জয়েশ ভাই ও আসবে দেখতে ক্ররুষ্ণার নতুন স্কুল।

মনে মনে বললাম, “ নাও আই আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াই ইট’স ‘উ’…”

images

Anindita Dutta Sinha

আমি ভালবাসাকে ভালবাসি... আমি জীবনকে ভালবাসি। পেশায়, ফ্রিলাইন্সার গ্রাফিক ডিসাইনার। আমার আমিটার জন্য যেটুকু সময় পাই, চেষ্টা করি টুকরো কিছু ভাবনা আর ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকে সাজিয়ে এক-একটা ছবি আঁকাতে। উইশস্ক্রিপ্ট-এর সাথে যুক্ত হওয়ার আহ্বান পেয়ে খুবই ভাললাগছে। অনেক শুভেচ্ছার সাথে , অনিন্দিতা

More Posts

Related posts

Leave a Comment